ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত ফলাফলের সঙ্গে হলভিত্তিক ফলাফলে গড়মিল পাওয়া গেছে। ১৮টি হলের ফলাফল যোগ করলে দেখা যায়, নয়জন প্রার্থীর ভোট কেন্দ্রীয় ফলাফলে বেশি আর নয়জনের কম দেখানো হয়েছে। এ গড়মিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা। তবে বিষয়টিকে ‘টাইপিং মিসটেক’ আখ্যা দেন চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ৭৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে ভোট গ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষণার সময় কেন্দ্রীয় ও হল সংসদে প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটে গড়মিল পাওয়া যায়। এতে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতেই রাতেই কেন্দ্রীয় সংসদের ফলাফল সংশোধন করে প্রকাশ করা হয়। তবে হলভিত্তিক ফলাফলে এখনো গড়মিল রয়েছে।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদে লানজু খানের ১,৫৭১ ভোট ফলাফলে কমে দাঁড়ায় ১,৫৩১। আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ সাকিবের ৩,৯৬২ ভোট হলেও ৩,৯২২ দেখানো হয় এবং একই পদে আতাউর রহমান অপুর ৫৯৮ ভোট কমিয়ে ৫৯৫ দেখানো হয়।
ক্রীড়া সম্পাদক পদে ছাত্রদলের প্রার্থী চিম চিম্যা চাকমার ৩,৮৮৮ ভোট ৩,৭৮৮ দেখানো হয়। শিবির প্যানেলের নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমার ৯,৫৪৮ ভোট থেকে ৫৬০ কমিয়ে ৮,৯৮৮ প্রকাশ করা হয়। আবিদ আব্দুল্লাহর ভোট ২,৪২৩ হলেও দেখানো হয়েছে ২,৩৮৩।
ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে শিবিরের প্যানেলের আসিফ আব্দুল্লাহর প্রকৃত ভোট ৯,১০১ হলেও ফলাফলে দেখানো হয়েছে ৯,০৬১। একই পদে আসিফ জারদারীর ২,০৫০ ভোটের স্থলে ৫০ কমিয়ে ২,০০০ দেখানো হয়েছে। শিবির সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচিত ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক মাজহারুল ইসলামের ভোট ৯,৮৪৪ হলেও ৫০০ কম দেখিয়ে ৯,৩৪৪ উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া সহ-সভাপতি প্রার্থী রিয়াজ উদ্দিনের প্রকৃত ভোট ৬ হলেও ফলাফলে ৮ দেখানো হয়। এজিএস প্রার্থী আশরেফা খাতুনের ৮৯০ ভোট দেখানো হয়েছে ৯০০। তেমনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ফাতিন ইশরাকের ২,০১১ ভোট ২,০২১ এবং ফারহান লাবিবের ৪৮৬ ভোট ৫২৬ দেখানো হয়। এছাড়া কয়েকজন প্রার্থীর ভোটসংখ্যা ১০ থেকে ১০০ পর্যন্ত বাড়তি বা কম দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রার্থীরা।
সাহিত্য সম্পাদক পদে লানজু খান বলেন, ‘প্রশাসনের ঘোষিত ফলাফলে আমার ভোট কম দেখানো হয়েছে।’ আন্তর্জাতিক সম্পাদক প্রার্থী সাকিবও ফলাফলে গড়মিলের অভিযোগ তোলেন। নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা জানান, তার ভোট ৯,৫৪৮ হলেও প্রকাশিত ফলাফলে ৮,৯৮৮ উল্লেখ করা হয়েছে।
চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীরা যে যোগফল পাচ্ছেন, সেটাই সঠিক। ভোররাত পর্যন্ত গণনায় ক্লান্তির কারণে টাইপোলজিক্যাল ভুল হয়েছে। তবে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হবে।
ফলাফল প্রকাশের পাঁচ দিন পর হলভিত্তিক ফলাফল জানালেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। কত ভোট পড়েছে, কত বাতিল হয়েছে—কেন্দ্রীয় বা সব হলে তা উল্লেখ নেই। ১৮টির মধ্যে শুধু ছয়টি হলে কাস্ট না হওয়া ও বাতিল ভোট উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো বিজয় একাত্তর হল, এফ রহমান হল, মুহসীন হল, জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল।
চিফ রিটার্নিং অফিসার বলেন, ‘আমরা আলাদা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এটি দিয়ে দেব। অফিস বন্ধ থাকায় কাজটি করতে পারিনি।’ মোট ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
১৮টি হলের ফলাফলে ভোটের হার উল্লেখ না থাকলেও ভিপি পদে মোট ভোট পড়েছে ২৯ হাজার ২৫৭টি, যা ৭৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ (মোট ভোটার ৩৯,৭৭৪ জন)। এর মধ্যে ছাত্র হলে ১৭ হাজার ১১০ (৫৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ) এবং ছাত্রী হলে ১২ হাজার ১৪৭ (৪১ দশমিক ৫২ শতাংশ) ভোট পড়েছে।
ভিপি পদে সাদিক কায়েম এককভাবে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ছাত্র হলে তার ভোট ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ছাত্রী হলে ৪৩ দশমিক ০১ শতাংশ। দ্বিতীয় হয়েছেন ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম, তিনি ১৯ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন (ছাত্র হলে ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ ও ছাত্রী হলে ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ)। স্বতন্ত্র উমামা ফাতেমা পেয়েছেন ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। শামীম হোসেন পেয়েছেন ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ (ছাত্রী হলে বেশি)। অন্যদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আবদুল কাদের ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র জামালুদ্দীন খালিদ ১ দশমিক ৭২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।