দেশে প্রতি বছর গুদামজাত চালের ২ থেকে ৬ শতাংশ নষ্টের অন্যতম কারণ এর আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হওয়া। বেশি আর্দ্রতার চাল গুদামে রাখলে ওজন যেমন কমে, তেমনি অল্প সময়ের মধ্যেই এর গুণগত মান নিম্নমুখী হয়। পোকামাড়কের আক্রমণও বেশি হয় এমন চালে। গুণগত মান নিশ্চিত, পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) কম আর্দ্রতার চাল গুদামজাত করার বিষয়ে জোর দিয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাটি বলছে, ১২ শতাংশ আর্দ্রতার চাল গুদামজাত করলে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ পুরোপুরি কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে পোকামাড়কের আক্রমণ বন্ধে স্বয়ংক্রিয় চালকল থেকে নতুন বস্তায় সরাসরি চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা দরকার। যদিও খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি চাল সংরক্ষণ নীতিমালায় চালের আর্দ্রতার পরিমাণ ১৪ শতাংশ। গুদামে সংরক্ষণের জন্য ১২ শতাংশ আর্দ্রতার চাল সংগ্রহ করে না খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে কোনো নীতিমালাও নেই। তবে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম আর্দ্রতার (১২ শতাংশ) চাল গুদামজাত করলে এর মেয়াদ বেশিদিন থাকবে, যথাযথ থাকবে পুষ্টিমান। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে এমন চাল।
জানা গেছে, সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন স্থানে সাইলোতে বহুতল খাদ্যগুদাম নির্মাণের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এরই একটি সান্তাহারের বহুতল খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত), যার প্রাক্কলিত ব্যয় ২৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫০ কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসেবে পাওয়া। আইএমইডি সান্তাহারের প্রকল্পটি পরিদর্শন করে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে খাদ্যগুদাম প্রকল্পে গুণগত মান নিশ্চিত ও নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষার জন্য ১২ শতাংশ আর্দ্রতার চাল সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
চালের আর্দ্রতাসংক্রান্ত আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, গুণগত মান বজায় রাখার জন্য প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গুদামে ১২ শতাংশের বেশি আর্দ্রতার চাল সংরক্ষণ সমীচীন হবে না। ওই প্রতিবেদনের অগ্রগতিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি চাল সংরক্ষণ নীতিমালায় চালের আর্দ্রতার পরিমাণ ১৪ শতাংশ। মন্ত্রণালয়ের মতে, শুধু গুদামে সংরক্ষণের জন্য ১২ শতাংশ আর্দ্রতার চাল সংগ্রহ করা হয় না। এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালাও তৈরি করা হয়নি।
পোকার আক্রমণ বন্ধে স্বয়ংক্রিয় চালকল থেকে নতুন বস্তায় সরাসরি চাল সরবরাহের প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির জন্যও আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় চালকল থেকে নতুন বস্তায় সরাসরি ওয়্যারহাউজে চাল সংগ্রহের নীতিমালা প্রক্রিয়াধীন।
বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. গোলাম রসুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কম আর্দ্রতার চাল সংরক্ষণ করা হলে তার মেয়াদ বেশিদিন থাকে। চাল দীর্ঘদিন ভালো থাকে। এমনিতেই আমাদের চাল সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত একটি অংশ নষ্ট হয়। এজন্য কম আর্দ্রতার চাল সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। এতে দীর্ঘদিন চালের গুণগত ও পুষ্টিমান বজায় রাখা সম্ভব হবে।’
এর আগে খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেশের খাদ্যগুদামগুলোয় খাদ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশ ও সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থার অভাবে গুদামে কীটের আক্রমণের শঙ্কার কথা উঠে আসে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ধান কেটে চাল বের করে আনার আগ পর্যন্ত ছয়টি ধাপে নষ্ট হচ্ছে উৎপাদিত চালের ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে ধান কাটার সময় ১-৩ শতাংশ, হ্যান্ডলিংয়ের সময়ে ২-৭, মাড়াইয়ে ২-৬, শুকানোয় ১-৫, গুদামজাতে ২-৬ ও পরিবহনে ২-১০ শতাংশ চাল নষ্ট হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সরকারি খাদ্যগুদামের অধিকাংশ স্থাপনাই বেশ পুরনো। এসব খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশের অভাবও রয়েছে। আবার দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সংরক্ষণ করতে গুদামে যেসব আধুনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন, তারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে এসব খাদ্যগুদামে কীটের আক্রমণের শঙ্কা থেকে যায়। বিভিন্ন সময়ে গুদামজাত খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এসব খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত খাদ্যশস্যে গন্ধ হওয়ার কথাও শোনা গেছে একাধিকবার।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আর্দ্রতা কম ও তাপমাত্রা বেশি। এ ধরনের আবহাওয়া কীটপতঙ্গ জন্মানোর আদর্শ পরিবেশ। দেশের গুদামগুলো বর্তমানে বেশ পুরনো হয়ে পড়েছে। এ কারণে এসব গুদামে সহজেই পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়। এজন্য খাদ্যশস্য সংরক্ষণে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়, যাতে পোকামাকড়ের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।