স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি লিওনিদ ব্রেজনেভের ভূমিকা নিয়ে—
সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধকালীন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের অন্যতম লিওনিদ ব্রেজনেভ। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৮ বছর দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সোভিয়েত ইতিহাসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সফল পররাষ্ট্রনীতির উদাহরণ ছিল তার শাসনামল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ে পর্দার আড়ালের এক বড় কারিগর ছিলেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টিকে সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন ব্রেজনেভ। রুশ লেখক রয় মেদভেদেভ জানাচ্ছেন, ১৮ বছরের শাসনামলে সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির যাবতীয় সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিতেন। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল আদতে ব্রেজনেভের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন।
পর্দার আড়াল থেকে রাখা লিওনিদ ব্রেজনেভের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে গিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। ১৯৭২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক সফরের সময় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ব্রেজনেভের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওরা (পাকিস্তানিরা) আমাকে ফাঁসি দেয়নি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভয়ে।
প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের সময় শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন লিওনিদ ব্রেজনেভ। ইতিহাসবিদ ও পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে ব্রেজনেভ তার সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় বরাবরই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এসেছেন।
পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া অবস্থান ওই সময় ব্রেজনেভকে বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ করেছে বলে ঐতিহাসিকদের রচনায় উঠে এসেছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ভ্লাদিস্লাভ জুবক জানাচ্ছেন, সোভিয়েতরা ভেবেই পেত না, যুক্তরাষ্ট্র কোন যুক্তিতে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। বিষয়টি প্রথমে ব্রেজনেভকে হতভম্ব করে তুলেছিল। পরে তা রূপ নিয়েছিল ক্রোধে।
তবে ইতিহাস বলছে, ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেও বিপজ্জনক সে মুহূর্তগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে বেশ ঠাণ্ডা মাথায় সামলেছেন ব্রেজনেভ। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বেশ শক্ত অবস্থান নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য রাখতেন মূলত দেশটির সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডিয়াম চেয়ারম্যান (প্রেসিডেন্ট) নিকোলাই পদগর্নি ও প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সেই কোসিগিন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করতেন ব্রেজনেভ নিজেই। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠলেও তা ভালোভাবেই বানচাল করতে পেরেছিলেন তিনি। তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের পরবর্তী সময়ে ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই চীনের উত্থান ঠেকানোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে মার্কিনদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মিত্রতার গুরুত্ব বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ব্রেজনেভ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রেমলিন বিশেষজ্ঞ ভয়টেক মাস্তনি তার এক গবেষণাপত্রে জানান, এশিয়ায় যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সোভিয়েত-ভারত চুক্তি কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে, তার একটি রূপরেখাও দাঁড় করিয়েছিলেন ব্রেজনেভ। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক মিত্রতা স্থাপনে চুক্তি সম্পাদনের জন্য অনেক দিন থেকেই আগ্রহী ছিলেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে তার এ আগ্রহের বাস্তবায়ন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত আনুষ্ঠানিক মিত্রতার চুক্তিতে সই করে ১৯৭১ সালের আগস্টে। বিষয়টি সে সময় পাকিস্তান ও তার মিত্র দেশগুলোর জন্য অনেক বড় একটি চাপের কারণ হয়ে দেখা দেয় বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে।
পাকিস্তানি ইতিহাসবিদদের দাবি, করাচির জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি প্রতিকূল হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে ২০ বছরের মিত্রতা ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সইয়ের পর। ইউনিভার্সিটি অব পেশোয়ারের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ ওয়াকার আলি শাহ ও বাচা খান ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক শায়েস্তা পারভীনের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, ব্রেজনেভের ব্রেইনচাইল্ড এ চুক্তি উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিপূর্ণ ভরাডুবিতে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এ চুক্তি সইয়ের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেপ্টেম্বরে তিনদিনের সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। প্রথম দিনেই লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ওই সফর চলাকালে ব্রেজনেভ ও তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সামরিকসহ সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব বাংলা থেকে আসা দুই কোটি শরণার্থীর চাপ সামলাতে গিয়ে ভারতের জন্য ওই সময়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু দুই পাশে পাকিস্তান ও চীনের মতো বৈরী প্রতিবেশী নিয়ে দেশটির পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সম্ভবও ছিল না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রেখেছে। এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্রেজনেভের আশ্বাস ছিল ভারতের জন্য সবুজসংকেত। বিষয়টি ওই সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াকুদের মনোবলও বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকখানি।
এ চুক্তির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১২টি ধারাসংবলিত ওই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে অন্য দেশ আক্রান্ত দেশের সমর্থনে এগিয়ে যাবে। এ বিষয়ই উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রকে।
প্রকৃতপক্ষে ওই সময়ে দৃশ্যমান যুদ্ধ চলছিল মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে। অন্যদিকে ভারতও যে এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হতে যাচ্ছে, সে বিষয়টিকে এ চুক্তিই স্পষ্ট করে তুলেছিল বলে ওই সময়কার কূটনীতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা পরবর্তী সময়ে নানা রচনায় তুলে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে ভারতের ওপর চীনের সম্ভাব্য হামলার যে আশঙ্কা ছিল, সেটিও এ চুক্তির মাধ্যমেই দূরীভূত হয়েছিল বলে অভিমত তাদের।
পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় এ চুক্তি নিয়ে বেশ আপত্তি জানায়। বিষয়টি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের ওপর কোনো আক্রমণ হলে মস্কো এ বিষয়ে চুপ থাকবে না।
এ চুক্তির পরই ব্রেজনেভ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেন। ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পাকিস্তানি ইতিহাসবিদ সৈয়দ ওয়াকার আলি শাহ ও শায়েস্তা পারভীন জানাচ্ছেন, আগস্ট থেকেই করাচি ও মস্কোর সম্পর্কের শীতলতা বাড়তে থাকে। পাকিস্তান সরকারকে দেয়া সব ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত রুশ বিশেষজ্ঞদেরও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। একই সঙ্গে সোভিয়েত আমদানিকারক সংঘের পক্ষ থেকে আফগান ব্যাংক-ই-মিল্লিকে বলা হয়, আফগানিস্তানে পাকিস্তানি পণ্য আমদানিতে কোনো ধরনের এলসি না খুলতে। নৌপথেও সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শুরু থেকেই করাচি বন্দরে সব ধরনের সোভিয়েত জাহাজের আগমন বন্ধ হয়ে যায়।
নভেম্বরের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোর পক্ষে মত দিয়ে গিয়েছেন সোভিয়েত নেতারা। আবার একই সঙ্গে ব্রেজনেভের এসব পদক্ষেপই বলে দিচ্ছে, ওই সময় পাকিস্তানকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না তিনি। ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে ওঠার পর থেকেই এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন ব্রেজনেভ।
ইতিহাস বলছে, ওই সময় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জাতিসংঘে তড়িঘড়ি করে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করলে তাতে কৌশলে ভেটো দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পাকিস্তানের পরাজয় এড়ানোর কৌশলটিও ব্যর্থ হয়ে পড়ে।
ওই সময়ে লিওনিদ ব্রেজনেভ নিয়মিত চিঠি চালাচালির মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সংযোগ রক্ষা করে চলেছেন ব্রেজনেভ। আবার একই সঙ্গে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিতেও যে তিনি প্রস্তুত, সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে সপ্তম নৌবহর ঠেকাতে ভ্লাদিভোস্তক থেকে সোভিয়েত নৌবহর রওনা করিয়ে দেয়ার ঘটনায়।
১৯৭৩ সালে ফাঁস হওয়া হোয়াইট হাউজের আরেকটি অডিও টেপ সূত্রে জানা যায়, যেদিন সোভিয়েত নৌবহর মার্কিন নৌবহরের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেয়, ঠিক সেদিনই পশ্চিম পাকিস্তানে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার ইচ্ছা নেই বলে ওয়াশিংটনকে দেয়া এক চিঠিতে জানান ব্রেজনেভ। তার এ চিঠিতে তুলে ধরা আশ্বাস সে সময় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে।