অব্যয়িত থাকছে বরাদ্দের ২২ শতাংশ

স্বাস্থ্যে অর্থ বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়নের হার নিম্নমুখী

আগামী অর্থবছরের জন্য দেশে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ৫ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরগুলোয় জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের

আগামী অর্থবছরের জন্য দেশে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ৫ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরগুলোয় জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের চিত্র প্রায় এমনই। শেষ হতে চলেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছর। এ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য সরকার জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রেখেছিল ৩৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা। তবে এ অর্থের পুরোটা খরচ করতে পারেনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তার সোয়া ৮ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে, যা মোট বরাদ্দের ২২ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে ফেরত দিতে হয়েছিল বরাদ্দের ১৯ শতাংশ। 

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পুরোটা ব্যয় করতে না পারার কারণে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অর্থ বরাদ্দ ও ছাড়করণে মানুষের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে খরচের ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম-নীতি রয়েছে তাতে কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ ফেরত যাচ্ছে। টাকা ফেরত গেলেও ঋণের সুদ সরকারকে মেটাতে হচ্ছে।

২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট এবং সংশোধিত বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে অব্যয়িত অর্থের হার বেড়ে চলেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অব্যয়িত থাকে, যা মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। 

২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দের ২ দশমিক ১০ এবং ২ দশমিক ১৬ শতাংশ অর্থ অব্যয়িত থাকে। এ দুই অর্থবছরে করোনা মহামারীর কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে যথারীতি অব্যয়িত অর্থের হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯ দশমিক ৮০ ও ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। 

২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার বিপরীতে ৭ হাজার ১১৬ কোটি টাকা অব্যয়িত থাকে। ওই বছর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তার অনুকূলে বরাদ্দের ২১ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ বরাদ্দের ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ ব্যবহার করতে পারেনি। যা মোট বরাদ্দের ১৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অব্যয়িত থাকছে ২১ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দের ২০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ বরাদ্দের ২৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। 

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ মূলত অব্যয়িত বেশি থাকে উন্নয়ন বাজেটে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর, ইনস্টিটিউট, সংস্থায় এখন অন্তত ৩০টি প্রকল্প চলছে। 

প্রকল্প সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটি হচ্ছে সরাসরি প্রকল্প, যেখানে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়। আর অন্যটি হচ্ছে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি), যেখানে লাইন ডিরেক্টর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। বেশির ভাগ অর্থই ফেরত যায় উন্নয়ন বরাদ্দের খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে যা ফেরত যাচ্ছে তা মূলত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যয়ের কথা ছিল। গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশব্যাপী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামোর কাজ করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে আটটি অধিদপ্তরসহ ২৫টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠান রয়েছে কয়েকশ। 

স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় গবেষণায় দেখেছি বাংলাদেশে বরাদ্দের অর্থ খরচের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধকতা) রয়েছে। সব নিয়ম-কানুন উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বরাদ্দ পরিচালন ও উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। এখানে পরিচালন খাতে কেনাকাটা থেকে শুরু করে অন্যান্য পরিচালনায় ব্যয় হয়। তবে সেখানে যেভাবে টাকা ছাড় দেয়ার পদ্ধতি রয়েছে তাতে প্রতিবন্ধকতা বেশি। আবার অনেক ক্ষেত্রে বছরের শেষ প্রান্তিকে গিয়ে অর্থ ছাড় পাওয়া গেলেও তা কম সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় না। অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে যে খরচ হওয়ার কথা তা হচ্ছে না ব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে। এখানে ঠিকাদারদেরও গাফিলতি রয়েছে।’

তার মতে, স্বাস্থ্য এমন একটি খাত যেখানে জীবন শুরু হয় এবং শেষ হয়। এ খাতকে অন্যান্য খাতের মতো করে বিবেচনা করলে হবে না। অগ্রাধিকার দিতে হবে। টাকা খরচ না করতে পারলে স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য কাঠামো সচল রাখা যাবে না। টাকা ফেলে রাখার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে না। অথবা ফেরত দেয়ার জন্যও নয়। জনবান্ধব প্রকল্প হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সচেষ্ট না থাকলে বছর বছর এমন অর্থ ফেরত যাবে। যে অংকের বরাদ্দ হয় তা অপর্যাপ্ত, আবার যা আসছে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। 

আরও