পাকিস্তান আমলে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দুটি ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয় কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের। ২০১৬ সালে সেই কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটকে জেনারেল কলেজে রূপান্তর করা হয়। নাম দেয়া হয় আলেকান্দা সরকারি কলেজ, বরিশাল। বর্তমানে ৫৮ বছরের পুরনো দুটি ভবনেই চলছে কলেজের কার্যক্রম।
ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে ক্লাসে অংশ নিতে হচ্ছে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে। ক্লাস চলাকালে মাঝেমধ্যে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। তবু কলেজ কর্তৃপক্ষ নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি বলে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান আমলে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দুই ভবনে কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের যাত্রা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে পলিটেকনিক থেকে আলাদা হয়ে এটি গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের ১২ মে সরকার এটিকে আলেকান্দা সরকারি কলেজ হিসেবে জেনারেল কলেজে রূপান্তর করে।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট ১৯৬৫ সালে দুটি ভবন নিয়ে কর্যক্রম চালিয়ে আসে। এখন ৫৮ বছর পর এসে সে পুরনো ভবনেই নতুন মোড়কে চলছে আলেকান্দা সরকারি কলেজের কার্যক্রম। ১৯৮১ সালে পলিটেকনিক থেকে আলাদা হওয়ার পর গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের জন্য শিক্ষকদের জন্য যে পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল এখনো সেই অধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক তিনজন ও প্রভাষক তিনসহ সাতজন শিক্ষকের পদই রয়েছে। অর্গানোগ্রাম পদ সৃষ্টি না হলেও সরকারি কলেজে বর্তমানে শিক্ষক সংযুক্তিকরণ করা হয়েছে ২০ জন। সব মিলিয়ে আগের সাতজন ও সংযুক্তীকরণ ২০সহ ২৭ জন শিক্ষক রয়েছেন কলেজে। আর ইতিহাস, সমাজকর্ম, গার্হস্থ্যবিজ্ঞান ও ব্যবসায় সংগঠন বিষয় থাকলেও পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষক নেই।
সেই পুরনো ভবন দুটি রয়েছে ভগ্নদশায়। তিনতলার মূল ভবনের নিচতলায় আছে অধ্যক্ষের কক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, অফিসার্স কাউন্সিল, পরীক্ষা দপ্তর, অফিস কক্ষ, স্টোর ও একটি শ্রেণীকক্ষ। দ্বিতীয় তলায় অর্ধেকজুড়ে রয়েছে ছাত্রীদের কমন রুম, বাকি অর্ধেকে রয়েছে আইসিটি ও গণিত বিষয়ের দুটি শ্রেণীকক্ষ। তৃতীয় তলায় জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ছাড়াও আরো দুটি বিষয়ের শ্রেণীকক্ষ রয়েছে। অন্য ভবনে কলেজ লাইব্রেরি, বঙ্গবন্ধু কর্নার, নিচতলায় কমার্সের শ্রেণীকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে তিন তলার ভবনের তৃতীয় তলার সব কক্ষই এখন ব্যবহার অনুপযোগী। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। প্রায় খসে পড়ে পলেস্তারা। বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এ ভবনে শ্রেণী কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বলেন, বিজ্ঞান ল্যাবের সব যন্ত্র ক্রয় করা রয়েছে। ভালো কক্ষ না থাকায় তা স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। এখন এ ভবনের কোন রুমে ল্যাবের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলে তা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। পলেস্তারা খসে পড়ে এসব যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কলেজ অধ্যক্ষকে দায়ী করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, কলেজের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও শ্রেণীকক্ষের সংকট দীর্ঘদিনের। বিষয়টি অধ্যক্ষ আমলে নিচ্ছেন না। দুই বছর যাবত বেশ কয়েকবার ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। ভবনের ভগ্নদশার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে অধ্যক্ষকে বারবার তাগাদা দিলেও তিনি কর্ণপাত করছেন না।
কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েম বলেন, ‘গত ১৬ জুলাই ক্লাস চলাকালে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে দুই শিক্ষার্থী আহত হন। আহত ওই দুই শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে এ কলেজের ভবন দুটিরও ভগ্নদশা হয়েছে। প্রায়ই এ ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ে। এমনকি বৃষ্টির দিনে ভবন থেকে পানি পড়ে। এর মধ্যেই আমাদের ক্লাস করতে হচ্ছে।’
কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ কলেজের এ ভবন নিয়ে ভাবছেই না। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাসে আসি। অধ্যক্ষ স্যারকে অনেকবার আমরা বলেছি কিছু একটা করেন। বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ভবন দুটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা দরকার।’
ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক পরিষদের নেতা বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেনকে অবগত করলে তিনি কলেজ পরিদর্শন করেন। তিনি একাডেমিক ভবনের ভপ্নদশা দেখে অধ্যক্ষকে নতুন ভবন চেয়ে একটি আবেদন করার জন্য অনুরোধ করেন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘চলতি মাসে আমার পদোন্নতি হওয়ায় আমি সিলেটে চলে আসি। অধ্যক্ষ সে পর্যন্ত কোনো আবেদন করেননি। বিষয়টি দুঃখজনক।’
কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহাদত হোসেন মৃধা বলেন, ‘কলেজের পুরনো দুটি ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভবন দুটি বর্তমানে জোর করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এখন নতুন ভবন না হলে চলে না।’
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাসুদ রেজার সেলফোনে কল দেয়া হলে তিনি ঢাকায় ট্রেনিংয়ে আছেন বলে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
তবে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সহযোগী অধ্যাপক (অর্থনীতি) সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘ভবনটি অনেক দিনের পুরনো। খুবই খারাপ অবস্থা। প্রায়ই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। গত ১৬ জুলাই পলেস্তারা খসে পড়ায় ছাত্রীরা আহত হয়েছে। এ ভবন ভেঙে এখন নতুন ভবন করা দরকার। না হলে এমন ঘটনা আবারো ঘটতে পারে। আর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর পরিদর্শনের পর আমি এখন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে আছি। শিগগিরই নতুন ভবনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করব।’