দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চিটাগং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স (সিসিসি) উদ্বোধন হয় ২০০৯ সালে। এরপর প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু করা যায়নি কারখানাটি। এর আগে বিদেশী একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এটি চালুর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি উধাও হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি কয়েক বছর ধরে থমকে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিসিসি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ২০০২ সালের ডিসেম্বরে। এরপর ২০০৯ সালে তা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই বছরেই কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে কারখানাটি উদ্বোধনও করা হয়। যেকোনো উপায়ে কারখানাটি চালু করতে গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সংশ্লিষ্টদের। পরে কারখানাটি চালুর দায়িত্ব দেয়া হয় চীনা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। চালু করতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে উধাও হয়ে যায়। এরপর থেকে কারখানা চালুর কার্যক্রম থমকে রয়েছে।
জানা গিয়েছে, ২০১১ সালে কারখানাটি চালু করতে প্রথম দরপত্র দেয়া হয়েছিল। চার দফা বাতিলের পর পঞ্চমবারে চীনের মেসার্স উহান অ্যানয়্যান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ১১৫ কোটি টাকায় একটি চুক্তি হয় বিসিআইসির। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বিসিআইসিকে বুঝিয়ে দেয়ার কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু নতুন পাঁচটি প্লান্টের সঙ্গে পুরনো দুটি মূল প্লান্টের সমন্বয় করতে ব্যর্থ হওয়ায় চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী কারখানাটিকে টানা ৭২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন সক্ষম করে তোলার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২০ বার চেষ্টা চালিয়েও এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয় ঠিকাদাররা। এরপর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আকস্মিকভাবেই উধাও হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
সিসিসি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে, ট্রায়াল রান চলাকালে প্রায় ১০৫ টন কস্টিক সোডা, ৫০ টন ক্লোরিন গ্যাস, ৬০ টন ব্লিচিং পাউডার ও প্রায় ৪০ টন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড উৎপাদিত হয় কারখানাটিতে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর সম্প্রতি এসব কেমিক্যাল বিক্রি করে দেয় সিসিসি। পাশাপাশি কারখানা চালু করতে বিসিআইসির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে আসা কয়েকশ প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বদলি করে দেয়া হয়। বর্তমানে উৎপাদনহীন এ প্রতিষ্ঠানে ৭২ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আনসার সদস্য কর্মরত রয়েছেন।
বিসিআইসির পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কারখানা চালু করতে ব্যর্থ হওয়ার পর বিসিআইসি ওই এলাকার অভ্যন্তরে ৬০ একর জমিতে একটি অত্যাধুনিক গ্লাস ফ্যাক্টরি নির্মাণের পরিকল্পনা করে। তবে বেসরকারি খাতের গ্লাস কারখানাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সেটিও বাতিল করে বিসিআইসি। বর্তমানে সিসিসির ৯১ একর জমিতে দৈনিক ১২০-১৫০ টন মাল্টিপারপাস কেমিক্যাল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আগে এ কারখানায় কস্টিক সোডা, লিকুইড ক্লোরিন, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও ব্লিচিং পাউডার উৎপাদন হলেও নতুন পরিকল্পনায় লিকুইড ক্লোরিন থেকে প্লাস্টিক পিলেট উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করতে সমীক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে কাজ করছে বিসিআইসির পরিকল্পনা বিভাগ।
জানতে চাইলে সিসিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিসির নতুন প্লান্ট স্থাপনের কাজ ভেস্তে দিয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়েও রাষ্ট্রায়ত্ত কেমিক্যাল কারখানাটি উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। বিসিআইসি কারখানাটি নতুন করে চালু করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আশা করি শিগগিরই এ-সংক্রান্ত একটি ঘোষণা আসবে।
জানা গেছে, সিসিসি চালু করতে না পারলেও দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটির দুই শতাধিক কর্মী বিনা কাজে বসিয়ে বেতন দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিসিআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার পর বিসিআইসি কারখানাটি সংস্থার নিজস্ব প্রকৌশলীদের দিয়ে নতুন করে চালুর পরিকল্পনা করেছিল। আগেও বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিএসপি কমপ্লেক্স, খুলনা নিউজপ্রিন্ট কারখানা ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি চালু করতে না পেরে ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে বিসিআইসির নিজস্ব প্রকৌশলীরাই কারখানা তিনটি চালু করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সিসিসির ক্ষেত্রেও এ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সিসিসির আগের দুটি পুরনো প্লান্টের সঙ্গে চীনা ঠিকাদারের স্থাপিত নতুন পাঁচটি প্লান্টের সমন্বয় করতে না পারায় সেটিও ব্যর্থ হয়।
বিসিআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, কারখানাটি চালু করতে না পারার পেছনে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার পাশাপাশি সংস্থাটির অদূরদর্শিতাও খানিকটা দায়ী। প্লান্টের নতুন ধরনের প্রযুক্তির সঙ্গে পুরনো প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রকল্প হাতে নেয়ার কারণেই কারখানাটি চালু করা যায়নি।
তাছাড়া বেসরকারি খাতের কেমিক্যাল উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর নানামুখী চাপের কারণেও কারখানাটি চালু করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেছেন বিসিআইসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ের পরও কারখানাটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার এটিও একটি কারণ বলে দাবি করেছেন তিনি।