পূর্ব জুরাইনের মিষ্টির দোকান চার রাস্তা মোড় থেকে উত্তর দিকে খানিক এগোলে হাজী খোরশেদ আলী সর্দার রোড। তীব্র গরম। রোদে পুড়ে যাচ্ছে শহরের অলিগলি। বৃষ্টির ছিঁটেফোঁটা নেই কোথাও। কিন্তু এ গলিতে সড়কে পানি দেখে থমকে যেতে হয়। খুব সাবধানে হেঁটে কিছুটা এগোলে দেখা মেলে আট-দশজন শ্রমিকের। পূর্ব জুরাইনে ড্রেন সংস্কারের কাজ করছেন তারা।
ড্রেন নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলছে ওয়াসার প্রধান পাইপ স্থাপনের কাজ। পদ্মা থেকে বিশুদ্ধ পানি আসবে রাজধানীবাসীর ফিল্টারে। দীর্ঘপথ বেয়ে জুরাইন পর্যন্ত আসার পর তা অনিরাপদ হয়ে ওঠে কিনা সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ ড্রেনের নোংরা পানির মধ্যে বসছে ওয়াসার প্রধান পাইপ। খোদ ওয়াসার শ্রমিকরা জানান, কাজটি ভুল হচ্ছে। নির্মাণ শ্রমিক মামুনের ভাষ্যে—‘প্রধান পাইপটি কোনোভাবে ড্রেনের মধ্যে পড়ার কথা নয়। ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে পাইপটি ফুটো হলে নির্ঘাৎ ময়লা পানি খাবারের সঙ্গে চলে আসবে।’
নতুন ড্রেনেজ লাইন নির্মাণের জন্য বিদ্যমান সড়ক থেকে স্ল্যাবের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় দেড় হাত ওপরে। ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ চলায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে এলাকাবাসীকে। কোলে শিশু নিয়ে খুব সাবধানে পথ চলছিলেন একজন নারী। নাম আসমা আক্তার। তিনি জানান, কয়েক মাস ধরে এমন ভোগান্তির মধ্যে জীবন চলছে তাদের। নির্মাণাধীন ড্রেনেজের এক পাশ দিয়ে চলতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখা গেছে মেগা সিটিতে বসবাসকারী জনগণের দুর্ভোগের চিত্র। কয়েকটি ছোট শিশু বেশ সাবধানতার সঙ্গে পা বাড়াচ্ছিল ড্রেনের এক পাশের ইটের গাঁথুনির ওপর। গাঁথুনির একেবারে শেষ মাথায় এসে লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে পড়ে যায় একটি শিশু। এ যাত্রায় তেমন ব্যথা না পেলেও এলাকাবাসী জানান, এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলতে গিয়ে অনেক শিশুই গুরুতর আহত হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, মশা, ডেঙ্গু, অপ্রতুল সড়ক, ময়লা পানি, গ্যাস না পাওয়ার মতো মৌলিক সমস্যায় ভুগলেও সড়ক উঁচু করে ড্রেন বানানো ছাড়া এ এলাকায় আর তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
হাজী খোরশেদ আলী সর্দার রোড থেকে বের হয়ে বিড়ি ফ্যাক্টরি রোড ধরে এগোলে কিছু দূর গিয়ে দেখা যায়, ড্রেন আর সুয়ারেজের ময়লায় রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে মানুষের যাতায়াত একেবারে কম। তবে যাদের বসতবাড়ি আছে, তারা বাধ্য হয়ে এ পথে চলাফেরা করেন। বিড়ি ফ্যাক্টরি রোডে বেশি দূর এগোনো যায়নি। পেছনে এলে পাওয়া যায় কুসুমবাগ সড়ক। এ সড়কের দুই পাশে এবড়ো-থেবরো বাড়ি। দেখতে কোনোটা দুইতলা, আবার কোনোটা তিনতলা। কোনোটা আবার একতলা। ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, রাস্তা উঁচু করার ফলে কারো বাড়ির একতলা রাস্তার সমতলের নিচে পড়ে গেছে। সেই জায়গায় পানি জমে তৈরি হয়েছে মশার প্রজনন কেন্দ্র। এলাকাজুড়ে প্রতিটি বাড়ির নিচতলা মশার লার্ভায় ছেয়ে গেছে। এর মধ্যেই বসবাস করছেন নারী-শিশু-বৃদ্ধরা।
স্থানীয় বাসিন্দা আরমান হোসেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের মশক কর্মীরা এখানে নিয়মিত ওষুধ স্প্রে করেন না। আর অবস্থা এমন, ওষুধ স্প্রে করেও কোনো কাজ হবে না।’
কুসুমবাগে নতুন সড়ক নির্মাণ শেষ হয়েছে। সড়ক নির্মাণ বলতে আগের সড়কই এখানে আরো উঁচু করা হয়েছে। জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বড় সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। এক যুগ ধরে আমরা জলাবদ্ধতা সমাধানের দাবি নিয়ে লড়াই করছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বারবার রাস্তা উঁচু করে সমাধান করে দিচ্ছে।’
রাস্তা উঁচু করাটা জলাবদ্ধতার সমাধান নয় উল্লেখ করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা হাতে-কলমে দেখিয়েছি বিদ্যমান ড্রেন, খাল ও পানি যাওয়ার পথ পরিষ্কারই একমাত্র সমাধান। আমরা একটি মডেলও দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা কানে তোলা হয়নি। উল্টো প্রতিবার প্রকল্প নেয়া হয়, আর সড়ক উঁচু করা হয়। এতে করে বাড়ি, দোকান ও স্থাপনা নিচে নেমে যায়। জলাবদ্ধতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়; ভয়ংকর আকার ধারণ করে ডেঙ্গু।’
কুসুমবাগ সড়ক ধরে আউটার সার্কুলার রোডে গিয়ে দেখা গেল, এখানে এক পাশে শেষ হয়েছে ড্রেনেজ নির্মাণকাজ। বাকি আছে রাস্তার ঢালাই। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ঢালাইয়েও অনিয়ম হচ্ছে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সহযোগিতায়। রাস্তা কিংবা ড্রেনের পাশে ফেলে রাখা ময়লা-আর্বজনাসহ ঢালাই দেয়া হচ্ছে রাস্তা ও ড্রেনের পাশের চওড়া জায়গা। পূর্ব জুরাইন ঘুরে দেখা গেছে, ড্রেনের ভেতর দিয়ে গেছে ওয়াসার পাইপ। জুরাইনের প্রতিটি ঘর-দোকান ঢেকে গেছে এক থেকে তিনতলা পর্যন্ত।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানান, ডেঙ্গু ও জলাবদ্ধতার সমস্যা মোকাবেলায় সিটি করপোরেশন রাস্তা উঁচু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আপাতত অন্য কোনো পরিকল্পনা সংস্থাটির নেই।