ড্যাপে রূপরেখা

বড় মাঠসহ ঢাকায় প্রয়োজন আরো ৬২৭ ‘ভালো স্কুল’

রাজধানী পোস্তগোলার বাসিন্দা আকতার হোসেনের সন্তান পড়াশোনা করে মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ে। কাছাকাছি ভালো স্কুল না থাকায় সন্তানের লেখাপড়ার জন্য প্রতিদিন তার পরিবারের অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়।

ঢাকায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বাড়েনি। যে কারণে আকতার হোসেনের মতো অনেকেই ভুক্তভোগী। এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও ন্যায্য নগরের দুর্বলতাই ফুটিয়ে তুলছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানী ঢাকাকে পরিকল্পিতরূপে গড়ে তুলতে বিশদ নগর পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-৩৫ প্রণয়ন করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সেখানে রূপরেখায় বলা হয়েছে, ঢাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর চাহিদার আলোকে বড় মাঠসহ আরো ৬২৭ ভালো স্কুল প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরূপ মতিঝিল আইডিয়াল, রাজউক স্কুল, ভিকারুননিসা নূনের মতো স্কুলগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে ড্যাপে।

ভালো স্কুলের রূপরেখা ড্যাপে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু ভালো রেজাল্ট নয় বরং প্রশস্ত মাঠ, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ, ওয়াশরুম, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, সিঁড়ি, বারান্দা, অফিস এমনকি শিক্ষার্থী প্রতি কতটুকু জায়গা বরাদ্দ দিতে হবেও তাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর এলাকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশির ভাগ মানসম্পন্ন স্কুল পুরান ঢাকার বাংলা বাজার, ধানমন্ডি, আজিমপুর, মতিঝিল, মিরপুরসহ এসব এলাকার আশপাশেই কেন্দ্রীভূত। এসব স্কুল আবার অনেক পুরনো। অর্থাৎ নতুন গড়ে ওঠা স্কুলগুলো মানের দিক থেকে এসব স্কুলের ধারেকাছেও যেতে পারছে না। অন্যদিকে রাজধানীর বড় জনগোষ্ঠীই নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মানসম্পন্ন স্কুলে সন্তানদের পড়াতে পারছেন না। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মানহীন স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করতে হয় তাদের।

ড্যাপসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ভালো স্কুলকে শুধু ফলাফল দিয়েই মাপার সুযোগ নেই। স্কুলের অবশ্যই প্রশস্ত মাঠ থাকতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষার পরিবেশের যেসব সংকটের কথা বলা হয় সেগুলোও পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম জরুরি।

ঢাকায় বিদ্যমান ভালো স্কুলগুলোয় রাজউকের সব শর্ত পূরণ করা না হলেও ভালো রেজাল্ট, বড় মাঠ—এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেখা গেছে বর্তমানে ঢাকায় ভালো মানের স্কুল আছে ৮৬২টি। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ২২৫টি, নতুন অন্তর্ভুক্ত ৩৫ ওয়ার্ডে ৫৯, রূপগঞ্জ-কালিগঞ্জে ১২৫ এবং সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ৪৫৩ বিদ্যালয় রয়েছে।

ড্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে সেগুলোকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোও স্কুলের অনুমোদন নেয়ার সময় ড্যাপের সুপারিশগুলো অনুসরণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকায় যে পরিমাণ মানুষ বেড়েছে সে অনুযায়ী ভালো স্কুল নেই। স্কুল মানে তিনটা রুম নিয়ে পড়ানো না। অথবা আমার বাচ্চাকে স্কুলে রেখে এলাম, আবার ছুটি হলে স্কুল থেকে নিয়ে এলাম এমনও না। স্কুলে তার জন্য খেলার জায়গা থাকবে না, পিটি করতে পারবে না, আড্ডা দিতে পারবে না, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে না এমনটা কাম্য নয়। স্কুল স্কুলের মতোই হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘‌এবারই প্রথম ঢাকার নগর পরিকল্পনায় স্কুল জোনিং করা হয়েছে। অর্থাৎ যে এলাকায় ভালো স্কুল আছে, সেখানে চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে আর ভালো স্কুল করা যাবে না। বরং যে এলাকায় ভালো স্কুল নেই সেখানে এ রকম বড় মাঠ, ভালো পরিবেশের স্কুল করতে হবে। ফলে কাউকে আর উত্তরা থেকে ধানমন্ডি সন্তানকে নিয়ে পড়াতে আসতে হবে না। এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে শিক্ষা সমস্যার তো সমাধান হবেই, পাশাপাশি যানজটসহ অনেক জটিল সমস্যা দূর হয়ে যাবে।’

ড্যাপে সুপারিশ করা এসব স্কুল কারা বাস্তবায়ন করবে জানতে চাইলে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যারাই স্কুল বানাবে ড্যাপ অনুসরণ করে বানাতে হবে। যেমন ভিকারুননিসা নূন তাদের নতুন একটা শাখা করবে। যে এলাকায় অলরেডি প্রয়োজনীয়সংখ্যক মানসম্পন্ন স্কুল আছে, রাজউক সেখানে আর কোনো অনুমোদন দেবে না। ফলে ভিকারুন নিসাকে নতুন শাখা খুলতে যেতে হবে জুরাইন, কেরানীগঞ্জ এসব এলাকায়। এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঝিলমিল, পূর্বাচলসহ পুরো ঢাকায় আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১০টি স্কুল বানানোর ব্যাপারে আলোচনা চলছে। সুপারিশগুলো যেভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করার কথা সেভাবে না হলেও একেবারেই যে হচ্ছে না তা নয়।’

বিদ্যমান স্কুলগুলোকেও ড্যাপের রূপরেখায় নতুন করে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। সে হিসাবে ঢাকায় ৮৬২ স্কুলের পাশাপাশি আরো ৬২৭ স্কুল প্রয়োজন। আর স্কুলগুলো হতে হবে আবাসিক এলাকার ১ কিলোমিটারের কম দূরত্বে। যাতে শিক্ষার্থীরা হেঁটেই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে আবার গাড়িও চলার প্রয়োজন হবে না। এতে ঢাকার যানজট কমার পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমবে। আর এর সরাসরি সুফল পাবেন নাগরিকরা। এতে তাদের ব্যয়ও কমবে ও সময়ও বাঁচবে।

স্কুলগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঢাকার ভেতরে, বাইরে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। মূল ঢাকায় এক রকম স্কুল। আবার ঢাকার বাইরের কিন্তু সিটি করপোরেশনের ভেতরের এলাকায় আরেক ক্যাটাগরির স্কুল। মূলত যে এলাকায় জনঘনত্ব বেশি সে এলাকায় স্কুলের ধারণক্ষমতা, আয়তন ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা আরো ৬২৭ স্কুল প্রয়োজন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১১১টি, নতুন অন্তর্ভুক্ত ৩৫ ওয়ার্ডে ১৬১, রূপগঞ্জ-কালিগঞ্জ ৮০ এবং সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ২৭৫ স্কুল প্রয়োজন। এলাকাভেদে এসব স্কুলের ভিন্ন রকম মডেল দেয়া হয়েছে ড্যাপে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় এলাকায় বিদ্যালয়ের রূপরেখা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এখানে প্রতিটি বিদ্যালয় ১৮ হাজার বর্গফুটের হতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা ১ হাজার ৫০০টি। দুই শিফটে মোট তিন হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। আর খেলার মাঠের জন্য জায়গা লাগবে ন্যূনতম এক একর। এ হিসেবে বিদ্যালয় হবে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত। শাখা হবে ছয়টি। প্রতি শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা থাকবে ২৫। তার মানে এক শ্রেণীতে ছয় শাখায় ১৫০ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে। বিদ্যালয়ে ছয়টি শাখার জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৬০টি শ্রেণীকক্ষ থাকবে।

একজন শিক্ষার্থীর জন্য ২০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দিতে হবে। এ হিসেবে শ্রেণীকক্ষের ক্ষেত্রফল হবে ৫০০ বর্গফুট। আর পুরো বিদ্যালয় সব শ্রেণীকক্ষের ক্ষেত্রফল হবে তিন হাজার বর্গফুট। তিনতলার বিদ্যালয়ের জন্য প্রতি তলা ১ হাজার বর্গফুটের শ্রেণীকক্ষ থাকবে। এখানে ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটি বিজ্ঞানাগার, ৭৫০ বর্গফুটের একটি লাইব্রেরি, টয়লেট ও বারান্দার জন্য ২ হাজার করে ৪ হাজার বর্গফুট, সিঁড়িঘর ২০০ বর্গফুট, অন্যান্য স্থান ৬৫০ বর্গফুট।

স্কুলের এসব প্যারামিটার এলাকাভেদে কমবেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সব এলাকার স্কুলের মাঠগুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে ড্যাপে।

ড্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী, ৬২৭ স্কুল নির্মাণ করলে ঢাকার অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌ঢাকার বড় সমস্যা হিসেবে বলা হয় যানজট, ফুটপাত দখল, বায়ুদূষণ ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর চেয়েও বড় সমস্যা হলো স্কুল সমস্যা। ঢাকায় স্কুলের জন্য যে কী ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা ভুক্তভোগী অভিভাবকরাই জানেন। এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় গাড়ি হাঁকিয়ে, জ্যাম ঠেলে স্কুলের জন্যই তো যাওয়া হচ্ছে। মানুষ এলাকা ছেড়ে দিচ্ছে ভালো স্কুলের জন্য। ড্যাপে এত সুন্দর পরিকল্পনা দেয়া হলো সেগুলো কোনো আলোচনাতেই আসছে না। সবাই ভবনের উচ্চতা বাড়ানো নিয়ে মাতামাতি করছে। কিন্তু এ নগরীতে যে স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, আগুন লাগলে নেভানোর পানি নেই, সে আলাপ কেউ করছে না।’

আরও