চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোয় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ডিপো কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মত দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্তে উঠে এসেছে ডিপো পরিচালনায় অবহেলার নানা বিষয়। যেমন দেখা গিয়েছে, ডিপোয় ফায়ার হাইড্রেন্ট ছিল না, বিপজ্জনক পণ্য কিংবা রাসায়নিক দ্রব্য হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই দুর্বল, কর্মীরা যথাযথভাবে প্রশিক্ষিতও ছিলেন না। যে প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড হ্যান্ডলিং করার কথা ছিল সেটিও মেনে চলা হয়নি। সব মিলিয়ে তদন্ত কমিটি বলছে, স্মরণকালের ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার দায় অবশ্যই ডিপো কর্তৃপক্ষের।
গত ৪ জুন বিএম কনটেইনার ডিপোয় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়। আগুন লাগার পর বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল আশপাশের প্রায় আড়াই বর্গকিলোমিটার এলাকা। ওই বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়ে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে নয়জনই ফায়ার সার্ভিসের সদস্য। এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং ফায়ার সার্ভিস আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠিত কমিটিই প্রথম প্রতিবেদন দিল।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কর্তৃপক্ষের নানা অবহেলা ও অসাবধানতার কথা। সেখানে বলা হয়েছে, রাসায়নিক পণ্য যে স্থানটিতে রাখা হয়েছিল তার ঠিক পাশেই ছিল টেক্সটাইল পণ্যের কনটেইনার। অথচ দাহ্য পদার্থের সঙ্গে টেক্সটাইল পণ্য রাখার কোনো সুযোগই নেই। এছাড়া যে জেরিক্যান বা জারে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাখা হয়েছিল, সেটি কোনো মানদণ্ডই পূরণ করে না। আগুন লাগার পর ডিপোর পক্ষ থেকে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমনকি ডিপোর সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসেরও কোনো সংযোগ ছিল না। এছাড়া হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে সে সম্পর্কে কর্মীদের কখনো কোনো প্রশিক্ষণও দেয়া হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে কিছু সুপারিশও যুক্ত করেছে কমিটি। সেখানে বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জন্য একটি বিশেষ সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজারের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি উপযুক্ত ডিপো নির্দিষ্ট করে সেখানে সব ধরনের আমদানি-রফতানিতব্য ডিজি কার্গো কিংবা রাসায়নিক পণ্য হ্যান্ডলিং করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সে ডিপোয় রাসায়নিক পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের নিরাপত্তাবিষয়ক সব ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আর তা করা না গেলে অন্তত প্রতিটি ডিপোয় আলাদাভাবে বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য হ্যান্ডলিং ও এর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। ডিপোগুলোর কাছাকাছি অঞ্চলে যেসব ফায়ার স্টেশন রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এমন কোনো চুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে, যার মাধ্যমে ডিপোরে কর্মীদের নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করা যায়। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। রফতানির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে কাস্টমসের পাশাপাশি নিরাপত্তার স্বার্থে বন্দরেরও যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কমিটি।
কমিটি বলছে, বিএম ডিপোয় ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনা নাশকতা সৃষ্টির জন্য ঘটানো হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ দুর্ঘটনাস্থলে অনেকগুলো গর্ত দৃশ্যমান হয়েছে, যেগুলো অস্বাভাবিক এবং সাধারণভাবে হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। আবার ধূমপানের পর ফেলে দেয়া অবশিষ্টাংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কিনা, সেটিও উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সে ব্যাপারে এখন থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্ত কমিটির যেসব সুপারিশ উঠে আসে সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক বন্দর কর্মকর্তা জানান, তদন্তে ডিপো কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতি প্রতীয়মান হয়েছে। একই কক্ষে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মজুদ করা ছিল। ডিপোয় একবারও করা হয়নি অগ্নিমহড়া। ফায়ার হাইড্রেন্ট তো নেই এমনকি অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না ডিপোর ভেতরে। বরং ডিপোর ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে জ্বালানি পাম্প। আগুন লাগার আধা ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিস। ডিপোর কর্মীদের কোনো ধরনের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ না থাকায় এর আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া যায়নি। এমনকি ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে আগুন নেভানোর সঠিক পদ্ধতি ঠিক করতে পারেনি। যেটি এ দুর্ঘটনাকে অনেক বড় পরিসরে নিয়ে গিয়েছে।