গ্রামের উন্মুক্ত স্থানে দৈনিক ফেলা হয় নোয়াখালী পৌরসভার ৪০ টন বর্জ্য

চর্ম ও শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা

এসব বর্জ্যের অর্ধেক অপসারণ করতে পারে কর্তৃপক্ষ, যা শহর থেকে অন্তত আট কিলোমিটার দূরের গ্রাম ধর্মপুরের উন্মুক্ত স্থানে ভাগাড় করে রাখা হয়।

শত বছরের পুরনো প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা নোয়াখালী। এ পৌরসভায় প্রতিদিন অন্তত ৮০ টন বর্জ্য একত্রিত হয়। এসব বর্জ্যের অর্ধেক অপসারণ করতে পারে কর্তৃপক্ষ, যা শহর থেকে অন্তত আট কিলোমিটার দূরের গ্রাম ধর্মপুরের উন্মুক্ত স্থানে ভাগাড় করে রাখা হয়। ফলে এসব ময়লা-আবর্জনা পচে দুর্গন্ধের পাশাপাশি বিষাক্ত পানি ও ধোঁয়ায় চর্ম এবং শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন উন্মুক্ত স্থানে এসব বর্জ্য রাখায় মানুষের পাশাপাশি মাছ, উদ্ভিদ ও প্রাণী বিনষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এটি বাস্তবায়ন হলে মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে।

নোয়াখালী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের শল্লাহ গ্রাম সরজমিনে দেখা যায়, চলাচলের পথ, ডোবা-নালা, পুকুর কিংবা মাছের ঘের—সবখানে মিশে গেছে ময়লা-আবর্জনার বিষাক্ত পানি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষায় এ বিষাক্ত পানির প্রবাহ আরো বাড়ে। শুষ্ক মৌসুমে ময়লার ভাগাড়ে দিন-রাত জ্বলে আগুন। এতে ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় পুরো গ্রাম। আর দুর্গন্ধ নিত্যসঙ্গী। এতে স্থানীয়রা বছরের পর বছর চর্ম ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া মরে ভেসে উঠছে পুকুর ও ঘেরের মাছ।

আনোয়ার হোসেন নামে ৪৫ বয়সী এক বাসিন্দা নিজের হাত দেখিয়ে বলেন, ‘গত দুই বছর পর্যন্ত কয়েকদিন পর পর হাতে ফোসকা উঠছে। ওষুধ খেলে যায়, কয়েকদিন পর আবারো দেখা দেয়। তার মাদরাসা পড়ুয়া ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রীরও একই অবস্থা। হাতে ও পায়ে বেশি দেখা দিচ্ছে এসব চর্মরোগ।’ আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, তাদের গ্রামে যখন ময়লার ভাগাড় করা হয়েছে তার কিছুদিন পর থেকে এমন রোগ প্রায় মানুষেরই হচ্ছে।

আরেক বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জানান, ২০২৩ সালের দিকে হঠাৎ করে তাদের গ্রামে সমিতির দোকান-সড়কঘেঁষে ময়লা রাখতে শুরু করে নোয়াখালী পৌরসভা। গ্রাম থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের নোয়াখালী পৌর শহরের সব ময়লা এনে রাখতে শুরু করে ওই উন্মুক্ত স্থানে। শহরের ময়লায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রামের মানুষের। তিনি আরো জানান, এটি রুখতে দফায় দফায় আন্দোলন করেছেন স্থানীয়রা। শুরুর দিকে তারা রাস্তায় নামার পর পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করবে। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি।

মোহছেনা বেগম নামে এক গৃহবধূ জানান, তাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা সাত। তার শ্বশুরের বয়স ষাটের বেশি। ঘরে তিনটি শিশু রয়েছে, মাসজুড়েই তাদের চর্মরোগ দেখা দেয়। শ্বশুর সম্প্রতি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন ভাগাড়ে আগুন দেয়া হয়, তখন ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। এতে তার কষ্ট আরো বাড়ে। ওই সময় ধোঁয়ার কারণে তাদের ঘরে থাকাও মুশকিল হয়ে পড়ে। আর বর্ষায় ময়লার কালো পানি পুকুর ও পথে ছড়িয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহরের বর্জ্যগুলোর মধ্যে সাধারণ আবর্জনার পাশাপাশি অনেক ভারী বা হাসপাতালের ময়লাও থাকে। কিন্তু আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ বর্জ্যগুলোকে খোলা জায়গায় রাখছে। ফলে সেসব ময়লা থেকে এক ধরনের পানি বা লিসেড উৎপন্ন হচ্ছে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত।’

গবেষণার বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ময়লার এ পানিতে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক ও মাইক্রোঅর্গানিজম থাকে। ফলে এগুলো আশপাশের খাল, পুকুর বা জমিতে গিয়ে পড়ার কারণে ভূ-উপরিভাগের পানির ডিজলভড অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। এতে মাছ ও বিভিন্ন জলজপ্রাণী অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। আবার সাধারণ বর্জ্যের পাশাপাশি হাসপাতালের বর্জ্য থাকায় জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ভাগাড়ের পাশের বাসিন্দা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলায় তা পশুপাখির মাধ্যমেও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ ও প্রতিবেশের নানা অনুষঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

নোয়াখালী পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় প্রতিদিন অন্তত ৮০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে গড়ে ৪০ টন বর্জ্য সরানোর সক্ষমতা রয়েছে পৌরসভার। এগুলো রাখা হচ্ছে শহর থেকে দূরে ধর্মপুর ইউনিয়নের শল্লাহ গ্রামে। ২০২২ সালে পৌর কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় ডাম্পিং স্টেশনের জন্য সেখানে সাড়ে ১২ একর জায়গা ক্রয় করে। সে সময় স্থানীয়দের জানানো হয় সেখানে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হলেও তৈরি হয়নি শোধনাগার।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বেলাল আহম্মেদ খান বর্জ্যের কারণে স্থানীয়দের নানা সমস্যা হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে যাদের মাছ মারা গেছে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য একটি প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ধীরগতিতে কাজ এগোনোয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা এখনো সম্ভব হচ্ছে না। তবে বারবার চেষ্টা করা হচ্ছে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার বাস্তবায়ন করার। এটি হলে সমস্যা দ্রুত শেষ হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রকল্পটির মধ্যে স্থানীয়দের জন্য একটি অস্থায়ী স্বাস্থ্য ক্লিনিকও রয়েছে। এছাড়া প্রকল্পজুড়ে টেকসই বাঁধ, সীমানা দেয়াল ও বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে।’

আরও