স্বাভাবিক সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে দিনে ১৫০ শিশুকে টিকা দেয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৫০ থেকে ৭০-এ। শুধু মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার নয়, দেশের সবখানেই টিকাদান কেন্দ্রগুলোয় এখন এ চিত্র দেখা যাচ্ছে। সর্বত্রই মন্থর হয়ে পড়েছে শিশুর জরুরি টিকাদান কর্মসূচি।
অন্য অনেক কিছুর মতো শিশুদের জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতেও ব্যাঘাত ঘটিয়েছে মহামারী। সংক্রমণের ভয়ে শিশুদের নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রগুলোয় আসছেন না অভিভাবকরা। ফলে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কমসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে পেরেছে দেশের টিকাদান কেন্দ্রগুলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৫০০টি টিকাকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিও, যক্ষ্মা, হাম ও রুবেলা, হেপাটাইটিস-বি ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ ১০ ধরনের রোগ প্রতিরোধের জন্য শিশুর জন্মের পর থেকে ১৫ মাসের মধ্যে মোট ছয়টি টিকা দেয়া হয়। চলতি বছরও ৩৭ লাখের বেশি শিশুকে এ টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। লক্ষ্য অনুযায়ী এর হার দাঁড়ায় এ সময়ে মোট জন্মগ্রহণকারী শিশুর ৯৯ শতাংশ। অন্যদিকে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গত চার মাসে লক্ষ্যের তুলনায় গড়ে ৭৭ শতাংশ শিশুকে টিকা দিতে পেরেছে টিকাদান কেন্দ্রগুলো।
মহামারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্যাও এখন শিশুর জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, আগামী মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে টিকাদানের হার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য বিভাগের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক শামসুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, লকডাউনের কারণে সাময়িকভাবে কিছুদিন টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল। এপ্রিল মাসে সব থেকে খারাপ অবস্থা ছিল। ওই সময়ে ৬৪টি জেলার মধ্যে ২২টি জেলায় টিকাদান কাভারেজ ৫০ শতাংশে নেমে আসে। বাকি জেলাগুলোতেও ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত
কাভারেজ করা সম্ভব হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এপ্রিলেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে মে ও জুনে ভালো ফল এলেও সম্পূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে বাদ পড়া সব শিশুকে টিকা দেয়ার কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।
এ সময় শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেত অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, টিকার কোনো সংকট নেই। এখনো আগামী তিন মাসের জন্য পর্যাপ্ত টিকার মজুদ রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে করোনার আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যক্ষ্মা প্রতিরোধী বিসিজি টিকার কাভারেজ ছিল লক্ষ্যের তুলনায় ৯১ দশমিক ৩ শতাংশ। এপ্রিলে এসে তা কমে হয় ৪৯ শতাংশ। মে মাসে কিছুটা উন্নতি হয়ে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ এসে দাঁড়ায়। জুনে লক্ষ্যমাত্রার ১১১ শতাংশ (আগে যাদের টিকা দেয়া হয়নি, তাদের একাংশসহ) অর্জন হলেও চার মাসের গড়ে এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ শতাংশ পিছিয়ে যক্ষ্মার টিকাদান কর্মসূচি।
এ চার মাসে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধী এমআর টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৭৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ছিল ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক হারে কমে এসেছে নিউমোনিয়া টিকা গ্রহণের পরিমাণও। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ডোজের নিউমোনিয়া প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করেছে লক্ষ্যের ৭৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিশু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৭১ ও ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ সময়ে পোলিওর প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছে লক্ষ্যের ৮০ দশমিক ১৫ শতাংশ শিশু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৭২ ও ৭০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এছাড়া হেপাটাইটিস-বি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-সিসহ পাঁচটি রোগ প্রতিরোধে পেনটা নামে যে টিকা দেয়া হয়, গত চার মাসে তা নিয়েছে গড়ে ৭৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ শিশু।
শুধু বাংলাদেশ নয়, মহামারীর কারণে গোটা বিশ্বজুড়েই টিকাদান কার্যক্রম আশঙ্কাজনক হারে শ্লথ হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, সময়মতো টিকা না নেয়ার কারণে আগামী ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে কমপক্ষে ২৮ হাজার।
লকডাউনের কারণে শিশুদের যেসব টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি, সেগুলো খুব তাড়াতাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সাঈদা আনোয়ার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সঠিক সময়ে টিকা না দিলে যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-সি ইত্যাদি রোগের আশঙ্কা থেকেই যায়। এসব রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।