পাটগ্রামে লাম্পি স্কিন ডিজিজে এক মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু

আতঙ্কে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষক ও খামারিরা

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি)। প্রতিষেধক না থাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোগটিতে এক মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) প্রতিষেধক না থাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোগটিতে এক মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক খামারিরা। জেলার অন্য চার উপজেলায়ও রোগ ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন খামারিরা। কম বয়সী গরুই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। প্রায় এক সপ্তাহ আগে রোগটি দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অনেকে গরু বিক্রি করে দিয়েছেন।

তবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলায় প্রায় লাখ ২০ হাজার গরু রয়েছে। লাম্পি স্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণে খামার বা গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ পশুর শরীরে রোগটি ছড়িয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ব্যাপারে কৃষক খামারিদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জগতবেড় ইউনিয়নের কচুয়ারপাড় গ্রামের খামারি মো. সফিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যেক বাড়ি গরুর শরীরে লাম্পি রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। আমার গরুর শরীরেও রোগটি ধরা পড়েছে। ভীষণ আতঙ্কে রয়েছি। কীভাবে রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে গুরুগুলো রক্ষা করা যাবে তা জানি না। স্থানীয় চিকিৎসকরা ভালো পরামর্শও দিতে পারছেন না। তবে সাহস দিচ্ছেন; বলছেন, এক মাসের মধ্যে রোগটি সেরে যাবে। শুধু প্যারাসিটামল সেবনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

পল্লী প্রাণী চিকিৎসকরা জানান, উপজেলার বাউরা ইউনিয়নে গত এক মাসে লাম্পি স্কিন ডিজিজে কৃষক খামারিদের কমপক্ষে ৫০টি গরু মারা গেছে। রোগে আক্রান্ত বাছুরের মৃত্যুর হার বেশি।

বাউরা ইউনিয়নের খামারি এমদাদুল হক জানান, কয়েক দিনের ব্যবধানে লাম্পি স্কিন রোগে তার খামারে তিনটি গরু মারা গেছে। আরো একটি আক্রান্ত হয়েছে। প্রথমে গরুর চামড়ায় গুটি ওঠে, পা ফুলে যায় এবং ঘন ঘন নিঃশ্বাস নেয়। এক পর্যায়ে মুখ দিয়ে লালা পড়ে খাবার বন্ধ করে দেয়। রোগের সঠিক চিকিৎসা না থাকায় খামারিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯২৯ সালে সর্বপ্রথম আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়ায় রোগটি দেখা দেয়। ১৯৪৩-৪৫ সালের মধ্যে মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। মশা-মাছিবাহিত রোগটি মূলত মশার মাধ্যমেই বেশি ছড়ায়। আক্রান্ত গরু সুস্থ হতে দীর্ঘদিন সময় লাগে। দিন দিন গরু-বাছুর দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মারাও যায়। একটি খামারকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দিতে খুরা রোগের চেয়েও বেশি ভয়ংকর এটি।

বাংলাদেশে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রথম দেখা দেয় ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে। এরপরই মাঠে নামে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তদন্ত টিম। তখন দেশের ১২ জেলায় ৪৮ হাজার গরুর মধ্যে রোগের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়। মূলত এটি পক্স ভাইরাস বা লাম্পিং স্কিন ডিজিজ ভাইরাসজনিত রোগ। ছাগল ভেড়ার পক্স ভাইরাসের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়। ভাইরাস গরু ছাড়া মহিষেও ছড়াতে পারে। এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। ছাগল ভেড়ায় প্রতিলিপি তৈরি করলেও এরা সাধারণত লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয় না। এছাড়া ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করে না। রোগটি প্রধানত বর্ষার শেষে, শরতের শুরু বা বসন্তের শুরুতে মশা-মাছির বেশি বিস্তারের সময় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

তবে রোগের চিকিৎসা সহজ নয়। আগে রোগটির আক্রমণ হলেও এর ভ্যাকসিন সহজলভ্য নয়। তবে খামারের ভেতর এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে মশা-মাছির উপদ্রব কমিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আক্রান্ত গরুর খামারের শেড থেকে আলাদা করে অন্য স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখলে অন্য গরুতে সংক্রমণ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আক্রান্ত গাভির দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে মাটিচাপা দেয়া উচিত।

ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় বিভিন্ন খামারে কিছু গরুর মধ্যে লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আমরা খামারিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। গরুর অবস্থা দেখে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ পশুর শরীরে রোগটি ছড়িয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আমরা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি। তবে অতিরিক্ত মশা-মাছি আক্রান্ত পশুর লালা থেকে দ্রুত রোগটি অন্য পশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়ে কৃষক খামারিদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

আরও