গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া

স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আলোচিত এ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান। নির্বাচনী পরিকল্পনা থেকে শুরু করে জয়লাভ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জায়েদার পাশে ছিলেন তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। হঠাৎ করে জায়েদা খাতুনের সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রচারণায় মাঠে নামা কিংবা

স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আলোচিত এ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান। নির্বাচনী পরিকল্পনা থেকে শুরু করে জয়লাভ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জায়েদার পাশে ছিলেন তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। হঠাৎ করে জায়েদা খাতুনের সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রচারণায় মাঠে নামা কিংবা মেয়র হিসেবে জয়ী হওয়া—রাজনীতি অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।    

রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, জায়েদা খাতুনকে শক্তিশালী প্রার্থী মনে না করার কারণে পরাজয় হয়েছে আওয়ামী লীগের। ক্ষমতাসীন দলের বিভাজনে ভাগ হয়ে যায় একই দলের সমর্থকদের ভোট। রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং দলটির সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি মনে করি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে। গাজীপুরে সেটাই হয়েছে। সেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।’

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পরাজয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে যে বিষয়টি কাজ করেছে সেটি হচ্ছে একজন বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ, অন্যজন আওয়ামী লীগ। প্রার্থীদের দুজনেই কিন্তু আওয়ামী লীগের। বাইরের কেউ নয়। সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গাজীপুরে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামীতেও হবে।’

তবে ভিন্ন কথা বলছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তারা মনে করে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার, সেটি দেশে নেই। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের অধীনে অবৈধ নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে নির্বাচন হচ্ছে। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আমাদের কোনো ধরনের আস্থা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এ নির্বাচনগুলোয়ও আমাদের কোনো আগ্রহ ও আস্থা নেই।’

তিনি বলেন, ‘এসব নির্বাচনে সরকার তার মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে কোনোটায় সুষ্ঠু দেখাতে চায়, কোনোটায় ভোট কারচুপি হয়। কোনোটায় প্রার্থী রাখে, কোনোটায় প্রার্থীদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। অর্থাৎ যেটায় সরকার মনে করে ভালো নির্বাচন দেখাবে সেটায় একধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। একটি বিষয় হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, যা দলীয় সরকারের অধীনে নয় বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে।’

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে সেটিতে গ্রহণযোগ্য বলতে নারাজ সুশীল সমাজ। তারা বলছেন, যেকোনো নির্বাচন হতে হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সেখানে দল কিংবা বিরোধী দল উভয়েরই অংশগ্রহণ থাকতে হবে। যেটি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা যায়নি। 

সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন,  ‘নির্বাচন হলো বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেয়া। এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, বিধায় এটি গ্রহণযোগ্য নয়। বৈধও নয়। বিরোধী দলের প্রার্থী না থাকলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয় না। তাই এটিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনে হারের জন্য পেছনে কতগুলো বিষয় ভূমিকা রেখেছে। জাহাঙ্গীর আলমের মায়ের কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। যেখানে আজমত উল্লা খান আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা। সেজন্য জায়েদা খাতুনকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। এটি আওয়ামী লীগের হারের একটি কারণ। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে মানুষ তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বহিঃপ্রকাশ এ নির্বাচন। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এ নির্বাচনে অন্যতম একটি প্রভাবক হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির পরিবর্তন। ভিসা বাতিলের বিষয়গুলো ছিল নির্বাচনী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মাথার ওপর খড়গ হয়ে ছিল। অর্থাৎ কোনো রকম অন্যায় করলে তাদের সে মাশুল দিতে হবে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলও যদি বাড়াবাড়ি করে তাদেরও মাশুল দিতে হবে। এটিও তাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য করেছে।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমন্বয় টিমের প্রধান ছিলেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পরাজয়ের কারণ এবং সার্বিক নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

রাজনীতি বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাজীপুরের নির্বাচনটি মূলত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড যাকে চেয়েছেন এবং তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ থেকে বের করে দেয়া প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। আমি মনে করি এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরাজয়। দলটির প্রার্থী আজমত উল্লা অত্যন্ত যোগ্য হওয়ার পরও হেরেছেন। দুঃশাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া সবকিছুর প্রতিফলন এ নির্বাচনে দেখা গেছে।’

তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষ অনীহার বার্তা দিয়েছে। দ্বিতীয় হলো এ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে গিয়েছে মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পর। অতএব মার্কিন ভিসা নীতিটা মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করার নতুন বার্তা দেয়। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচনের ধারাটি বোঝা যায় বলে একটি ধারণা করা হয়। এ নির্বাচনে হামলা, নির্বাচন কার্যক্রমে বাধা দেয়াসহ নানান অভিযোগ জাহাঙ্গীর আলমের মা করেছে। এটাও একটা বার্তা দেয় যে হাইকমান্ড যাকে চায় না সে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেও তার বিরুদ্ধে হামলা হয়। তবে তিনি খুব ভাগ্যবান। মার্কিন ভিসা নীতি যদি তিন-চারদিন পর ঘোষণা হতো তাহলে কী হতো এটা বেশ কৌতূহলের বিষয়।’

তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সাংগঠনিক বিভিন্ন নেতা। তারা বলছেন, কে জয়ী হলো সেটি বড় কথা নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে সেটি মুখ্য বিষয়। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে এটাই বড় কথা, কে জয় পেল আর কে পরাজিত হলো সেটা বিষয় নয়। নির্বাচনে একটি জায়গায়ও কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, নৌকা হারলেও শেখ হাসিনার জয় হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন, সেটা হয়েছে।’

দলটির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত শুরু থেকে বলে আসছে, ভোটারবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, এ নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম”বিএনপি-জামায়াতের লোকজনও নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, সবার কাছে এটিই বিবেচিত হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজয়ের কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে এটাই বড় কথা। এখানে হারজিত বড় বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে কেন নৌকার পরাজয় হয়েছে সেটা আমাদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি বসবেন, তার পরে বলা যাবে।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফলাফল মেনে নিয়ে বিজয়ীকে অভিনন্দন জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গতকাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে দলের পক্ষে এ প্রতিক্রিয়া জানান দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। 

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হলে দেশের মানুষ যতটা খুশি হতেন, তার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন হওয়ায়। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই, জনগণকে ধন্যবাদ এবং বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাই।’

এ নির্বাচনে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এতদিন মিথ্যাচার করে এসেছে যে এ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা ওয়াদা পূরণ করেছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারবে কিনা তার চেয়ে বড় কথা হলো গণতন্ত্র জয়লাভ করেছে।’

গাজীপুরে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কাজে আওয়ামী লীগের ২৮ সদস্যদের কেন্দ্রীয় টিমের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা আজম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অধীনে গাজীপুরে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। তাতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। আমরা সেই পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছি।’

আরও