প্রায় তিন বছর ধরে চরকায় সুতা কাটার কাজ করে মাসে উৎপাদন অনুযায়ী ১৪-১৫ হাজার টাকা মজুরি পান তিনি। উপার্জিত অর্থ তার পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা এনেছে। শুধু শান্তিরূপা চাকমা নন, পাহাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা নারীদের হাতে সুতো আর তাঁত যেন হয়ে উঠেছে স্বপ্ন বোনার হাতিয়ার। সংসারের কাজের ফাঁকে তাঁতে কাপড় বুনে কেউ বাড়াচ্ছেন পরিবারের আয়, কেউবা ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরির মাধ্যমে গড়ে তুলছেন নিজের পরিচয়। রাঙ্গামাটির পাহাড়ি নারীদের এমন স্বাবলম্বিতার গল্পই উঠে এসেছে তাদের সুতো ও তাঁতের কাজে।
শান্তিরূপা জানান, তিন বছর আগে সাংসারিক কাজের পাশাপাশি আয়বর্ধক কাজ শুরু করার বিষয়টি তার ভাবনায় আসে। এরপর বিসিক থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি এখন পিনোন তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ভালোভাবে তাঁত বুনতে পারলে চার-পাঁচটি পিনোন তৈরি করা যায়। একটি পিনোনের দৈর্ঘ্য ছয় ফুটের বেশি। আর মাসিক মজুরি ১৪-১৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। সাংসারিক কাজের বাইরে অলস সময় কাটানোর চেয়ে তাঁত বুনলে আয় হবে। এ ভাবনা থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম।’
একই কারখানায় চাকমা জনগোষ্ঠীর আরেক পরিধেয় পোশাক হাদি (ওড়না হিসেবে ব্যবহৃত) বুনছিলেন প্রীতি চাকমা (৩৮)। আলাপকালে তিনি জানান, একই কারখানায় তার তাঁত বোনার প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ হাতেখড়ি। আবার সেই কারখানাতেই এখন কারিগর হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
প্রীতি চাকমা বলেন, ‘আমি এ কারখানায় কাজ শিখেছি। পরে এখানেই কারিগর হিসেবে কাজ করছি। এখন উৎপাদন অনুযায়ী মজুরিভিত্তিক কাজ করছি। আমি হাদি তৈরি করি। প্রতিদিন তিন-চারটি হাদি বোনা যায়। প্রতিটির মজুরি ১৩০ টাকা।’
বর্তমানে কারখানাটিতে ১১টি তাঁতযন্ত্র রয়েছে, যেখানে কারিগর হিসেবে নারীরাই কাজ করেন। সেখানে কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ছাড়াও অন্যান্য নারীও রয়েছেন।
কারখানাটির মালিক রেপসী চাকমা বলেন, ‘এখানে আসলে মেয়েরা কাজ করে অনেক টাকা পান, তেমন নয়। তাঁত হলো শিল্প ও আদিবাসীদের ঐতিহ্য। মেয়েরা এখানে কাজ শিখছে এবং কিছু খরচের জন্য টাকা পাচ্ছে। আমরা প্রতিটি পিনোন ১২০ ও হাদি ১৩০ টাকা হিসেবে উৎপাদন মজুরি দিয়ে থাকি।’
ভালেদীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বিনোতা চাকমা (৪১) ঘরের সামনে বসে কোমর তাঁতে পিনোন বুনছিলেন। মূলত তিনি সাংসারিক কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে কোমর তাঁতে পিনোন-হাদি বোনেন। নিজেদের পরিধানের পাশাপাশি বাড়তি বোনা কাপড় বিক্রি করেন।
বিনোতা চাকমা বলেন, ‘আমি অনেক বছর ধরে পিনোন-হাদি কাপড় বুনছি। একটি পিনোন ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে বিয়ের পিনোনগুলো বিশেষ অর্ডার থাকলে তৈরি করা হয়; সেগুলোর দাম একটু বাড়তি হয়। সাধারণত ১৫-২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’
রাঙ্গামাটিতে তাঁত শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য তাঁত বোর্ড রাঙ্গামাটি বেসিক সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ অফিসার চার্চিল চাকমার মুঠোফোনে কল দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. ইসমাইল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কোমর তাঁতের ওপর স্থানীয় নারীদের তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। রাঙ্গামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও রাজস্থলী উপজেলায় প্রশিক্ষণ প্রদান কার্যক্রম চলমান আছে।’