কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ বেশি নিয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে বেসরকারি খাত ঋণ কম পেয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। মে ও চলতি জুনে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা আরো বেড়েছে। আর একই সময়ে বেসরকারি খাত তথা উদ্যোক্তারা আরো বেশি ঋণবঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ব্যাংক খাত থেকে নিট ৩২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের নেয়া এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮ হাজার ১৮২ কোটি টাকায় ঠেকেছে। সে হিসাবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক থেকে সরকার ৭৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বা তিন গুণ বেশি ঋণ নিয়েছে। যদিও চলতি অর্থবছরের শুরুতে যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল, তাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের নেয়া নিট ঋণ সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যও ছাড়িয়ে যাবে। কারণ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। মে ও জুনে এ ঘাটতি আরো বাড়বে। আর রাজস্ব ঘাটতির বড় অংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিমাত্রার নির্ভরতা বেসরকারি খাতকে আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকারের আয়ের সক্ষমতার তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণেই ব্যাংক থেকে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেশি হওয়ায় এ ঋণের পেছনে সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে। ব্যয় কমিয়ে এনে আয় বাড়ানোর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।’
সাবেক এ সিএজি আরো বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি খাত খারাপ সময় পার করছে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না কিংবা ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো চাহিদাও দেখা যাচ্ছে না। ঋণের সুদহারও বেশ উচ্চ। বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনের অনুকূলে নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে বেসরকারি খাতকে অবশ্যই প্রাণবন্ত করতে হবে। আর এজন্য ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’
বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। আর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ৮০ শতাংশেরও বেশি। যদিও অর্থনীতির এ প্রধান খাতই কয়েক বছর ধরে ধুঁকছে। বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিরাজমান এ ঋণ প্রবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে বিরল বলে ব্যাংক নির্বাহীরা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের যে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, সেটিও নতুন ঋণের প্রবৃদ্ধি নয়। বরং খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের অনাদায়ী সুদের প্রবৃদ্ধি এটি। অতীতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় সবই এখন খেলাপি। এসব ঋণ থেকে ব্যাংকগুলোর কোনো আয় নেই। অনাদায়ী সুদ যুক্ত হওয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে। বিপরীতে দেশের ভালো ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি না বেড়ে উল্টো কমে এসেছে। দেশের অন্তত চারটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।
ব্যাংক নির্বাহীদের এ বক্তব্যের সত্যতা মিলছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে। যেমন এ মুহূর্তে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসাবে স্বীকৃত ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি না বেড়ে উল্টো কমেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৭৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ স্থিতি কমে ৭১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বিপরীতে বিনিয়োগ বেড়েছে সরকারি বিল-বন্ডে। গত ডিসেম্বর শেষে এ খাতে ব্র্যাক ব্যাংকের বিনিয়োগ স্থিতি ছিল ৪১ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ স্থিতি ৪৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। দেশের বেশির ভাগ ভালো ব্যাংকের চিত্রও ব্র্যাক ব্যাংকের মতো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার এ চিত্র উঠে এসেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বেসরকারি খাতে নিট ঋণপ্রবাহ ছিল ৫৫ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগের তুলনায় চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাত ২৪ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার ঋণ কম পেয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের জন্য ১০-১২ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো তিন-চার বছর ধরেই উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার পরিবর্তে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী। সরকারের দিক থেকে ঋণের চাহিদা না কমলে বেসরকারি খাতের সংকট কাটবে না। মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলে ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখছি, মূল্যস্ফীতি না কমে উল্টো বাড়ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১৪-১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতে যে স্থবিরতা চলছে, এটি অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি আরো বড় বিপদের মুখে পড়বে।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এক মাসের ব্যবধানে, মার্চ শেষে তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৬ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা সহসা কমবে এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। বরং অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ বলছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতিতে এ বিষয়ে বলা হয়, আগামী তিন বছরে সরকারের ঋণ স্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে যা দেশের সার্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। এর পরবর্তী অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে এবং তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে এ ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। এ বিশাল ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান থাকবে ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
ঋণের এ উল্লম্ফন স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সুদ ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বাজেটের একটি বড় অংশই চলে যাবে বিগত বছরগুলোর ঋণের মাশুল গুনতে, যা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বরাদ্দকে সংকুচিত করতে পারে। আর অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ ব্যাংক থেকে নেয়ায় বেসরকারি খাত আরো বেশি ধুঁকবে।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেই বলে জানান ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এ সময়ে তেমন কোনো নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হয়নি। এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে নেমে গেছে। আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে ঋণের এত কম চাহিদা অতীতে দেখিনি।’
মাসরুর আরেফিন আরো বলেন, ‘বেসরকারি খাতকে প্রাণবন্ত করতে বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু্ উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াবে। আশা করছি, ব্যাংকগুলো প্রণোদনা স্কিম বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’