স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রতিরোধের মঞ্চে বিশ্ববিদ্যালয়

ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে প্রিন্সটন থেকে পিকিং, মর্যাদা হারিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাক্তন সভাপতি জন উইদারস্পুনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি একসময় পরিণত হয়েছিল ‘বিদ্রোহের আঁতুড়ঘরে’।

জ্ঞানদীপ্তির আদর্শ, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তিনি দেশপ্রেমিক এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। ১৭৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে প্রিন্সটনের নাসাউ হলে কনফেডারেশন কংগ্রেসের কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সংবিধানের প্রধান স্থপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট জেমস ম্যাডিসনের মতো রাষ্ট্র বিনির্মাণের অনেক কারিগরও তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। রাষ্ট্রগঠনে ঐতিহাসিক অবদান রাখার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষাতেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রেখেছে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান তৃতীয়।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় এক শতক পর মুক্তিসংগ্রাম ও জাতি গঠনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে জাপানের কাছে যুদ্ধে পরাজয়ের পর সামন্ততান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় চীন। সেই সংস্কারের অংশ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয় দেশটির প্রথম আধুনিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন ধারার সূচনা করে প্রতিষ্ঠানটি, যা প্রভাব বিস্তার করে দেশ-বিদেশে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২১৬টি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৩তম।

উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনেরও কেন্দ্রবিন্দু ছিল পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পর, ১৯১৯ সালে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ‘মে ফোর্থ আন্দোলনে’ নেতৃত্ব দেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরেই মার্ক্সবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকদের নেতৃত্বে গণতন্ত্র, বিজ্ঞান ও আধুনিক কথ্য ভাষাভিত্তিক জাতীয় সংস্কৃতির ধারণাও নতুনভাবে বিকশিত হয়। ইতিহাসের নানা সন্ধিক্ষণে জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান অটুট রেখেছে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বেই সংঘটিত হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তারা ছিলেন অগ্রভাগে। একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্বে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সর্বশেষ শেখ হাসিনার পতন ঘটানো ২০২৪ সালে আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানেও নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

স্বাধীনতা অর্জন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখলেও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ক্রমেই অবনমন ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সময়ের পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মাণেও ভূমিকা রেখেছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) ২০২৭ সালের বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৬০০তম। একইভাবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৭’-এও সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় সীমিত; সামগ্রিক বাজেটের মাত্র ২-৩ শতাংশ ব্যয় হয় এ খাতে। তবে সীমিত এ বরাদ্দও পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ কাগজে-কলমে সক্রিয় থাকা অনেক গবেষণা কেন্দ্রের বাস্তবে কার্যক্রম নেই। অনেক কেন্দ্রের নিজস্ব কার্যালয়, পরিচালক কিংবা প্রয়োজনীয় জনবলও অনুপস্থিত। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রের কার্যক্রম সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জাতির সংকটে যেমন থাকবে, তেমনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাবে। দুটো বিষয়েই আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সেখানে হয়তো ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই আমরা পার হয়েছি। কিন্তু থেমে থাকিনি। এখনো দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি আছে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায়ও ভালো অবস্থানে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংয়েও অবস্থান ওপরের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষা ও রাষ্ট্রচিন্তার পাশাপাশি আমরা গবেষণায়ও এগিয়ে যাচ্ছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা খাতের চিত্র পর্যালোচনা করে হতাশাজনক তথ্যই পাওয়া যায়। গবেষণার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রাপ্ত অর্থের পুরোটা ব্যয় করতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি ৭ লাখ, বিপরীতে ব্যয় ১২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দকৃত অর্থের ৩৭ দশমিক ১৬ শতাংশ অব্যয়িত থেকে গেছে। এছাড়া গত পাঁচ বছরে মোট বরাদ্দ ছিল ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। যেখান থেকে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয়ই করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রগুলোর চিত্র আরো হতাশাজনক। গত পাঁচ অর্থবছরে বরাদ্দের ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারেনি গবেষণা কেন্দ্রগুলো।

বিশ্বব্যাপীয় মূল্যায়নেও পিছিয়ে পড়ছে দেশের প্রাচীন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রিকে তাদের মূল্যায়ন কাঠামোয় ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমান হিসেবে বিবেচনা করে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে অ্যাক্রেডিটেশন। এ লক্ষ্যেই ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সাত বছর পরও তারা কোনো অ্যাক্রেডিটেশন সনদ ইস্যু করতে পারেনি।

অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্রগঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের গবেষণা, একাডেমিক উৎকর্ষ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অবস্থানও সুদৃঢ় করেছে। এর অন্যতম উদাহরণ দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট হেয়ার আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক আঁতুড়ঘর হিসেবে সমাদৃত। কয়েক দশক ধরে সাব-সাহারান আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ছিল উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীকালে মহাদেশজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক জেড কে ম্যাথিউস ‘কংগ্রেস অব দ্য পিপল’-এর ধারণা প্রস্তাব করেন। ১৯৫৫ সালের এ উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর মতামত নিয়ে প্রণয়ন করা হয় ‘ফ্রিডম চার্টার’-এর খসড়া, যা আজও দেশটির গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত। ফোর্ট হেয়ারের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আফ্রিকার একাধিক নব্যস্বাধীন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনা তাদের ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করেছিল।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ র‍্যাংকিংয়ে ১৭তম অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর। বিশ্ববিদ্যালয়টির পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেগুলো উপনিবেশবিরোধী চিন্তা ও জাতীয় চেতনার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। পরবর্তী সময়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই সংহত, বহুজাতিক ও উন্নত জাতি-রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

চেক জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুও ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নাৎসি দখলদারত্ব এবং পরবর্তী কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়েও চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ৫০০-এর মধ্যে রয়েছে।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়। গোপন প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ১৯৫৬ সালের ১৯ মে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের (এফএলএন) আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়টির মুসলিম শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা বর্জন করেন। তাদের একাংশ সরাসরি পাহাড়ি গেরিলা ঘাঁটিতে (মাকি) যোগ দিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেন। অন্যরা এফএলএনের জন্য চিকিৎসাসেবা, রসদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর এসব ছাত্রনেতা ও বুদ্ধিজীবীর অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং ডাক্তার, কূটনীতিক, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে আধুনিক আলজেরীয় রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখেন।

বিপরীতে ঐতিহাসিক ভূমিকা সত্ত্বেও গবেষণা, অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গবেষণা খাতে প্রিন্সটন থেকে শুরু করে র‍্যাংকিংয়ে থাকা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের পরিমাণ থেকেই পার্থক্যের কারণটি প্রতীয়মান হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু গবেষণায়ই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে থাকে। যেখানে বছরে মাত্র ২০ কোটি টাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়ে থাকে। যেখানে সর্বমোট ২ হাজার ২০০ শিক্ষক আছেন। এ স্বল্প বরাদ্দে গবেষণা করে নতুন জ্ঞান তৈরির মতো কাজটি করা দুরূহ। এ সংকটের পরও হার্ভার্ড, এমআইটি কিংবা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাবির ছাত্ররা পড়ালেখা করছেন এবং ভালো করছেন। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয়প্রতিপন্ন করার সুযোগ নেই।’

গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণার মান অনেক বেশি অবনমিত হয়েছে। ২০০৯-২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে খোলা হয় নতুন ১৬টি বিভাগ ও পাঁচটি ইনস্টিটিউট। অভিযোগ রয়েছে, একচেটিয়া প্রভাব তৈরির জন্য আওয়ামী অনুগত শিক্ষক বাড়াতেই বিভাগগুলো খোলা হয়। এর মধ্যে প্রয়াত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯-১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ দেন ৯০৭ শিক্ষক। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিতে তিনি বেশকিছু ক্ষেত্রে যোগ্যতাও শিথিল করেছিলেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০১৭-২৪ সাল পর্যন্ত আরো পাঁচ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। যেখানে আওয়ামীপন্থী নীল দলের একচেটিয়া আধিপত্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে একটি জাতিকে এগিয়ে নেয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। সে জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অর্জন নিঃসন্দেহে গৌরবের। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দায়িত্ব উচ্চমানের শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যাশিত গুরুত্ব দিতে পারিনি। গবেষণা, শিক্ষা ও মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।’ উপযুক্ত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু বাংলাদেশেই নয়, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্যে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে বলে মনে করেন তিনি।

দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাত উভয়ই খাদের কিনারায় অবস্থান করছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে ঘটেছে নজিরবিহীন সব লুণ্ঠন ও কেলেঙ্কারির ঘটনা। কারসাজির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বের করে নেয়া হয়েছে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) ব্যবহৃত হয়েছে দুর্নীতিবাজদের হাতিয়ার হিসেবে। দেশের আর্থিক খাতের এ দুরবস্থার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে দায়ী করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রশাসন, অর্থনীতি ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের আর্থিক খাতের একাধিক বিতর্ক ও কেলেঙ্কারিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকজন সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। দেশের ব্যাংক খাতে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠন, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো একের পর এক বড় কেলেঙ্কারি ঘটে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে। এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তার আমলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাও ঘটে। যার ফলে ২০১৬ সালে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। ড. আতিউর রহমান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবেও যোগ দেন।

দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক যুগেরও বেশি সময় চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক। তারা হলেন ফাইন্যান্স বিভাগের ড. এম খায়রুল হোসেন এবং ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান হিসেবে এ দুই অধ্যাপকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও স্বজনপ্রীতির কারণে পুঁজিবাজার আরো খাদের কিনারে এসে পৌঁছায়। জালিয়াতি, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও প্রতারণার মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে গত ১৫ বছরে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি লুণ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ দুই সাবেক শিক্ষার্থী।

দেশের ইতিহাসে প্রথম পলাতক গভর্নর ও সাবেক অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখান থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। অর্থ ব্যবস্থার মৌলিক নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি নিরুদ্দেশ হন।

দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান দুরবস্থার প্রধান দুই কারিগর ধরা হয় সাবেক দুই আমলা মো. আবুল কালাম আজাদ ও আহমেদ কায়কাউসকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক চাপ তৈরির জন্য বিদ্যুৎ সচিব হিসেবে তাদের ভূমিকাকে অনেকাংশেই দায়ী করা হয়। এর মধ্যে আবুল কালাম আজাদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্রগঠন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগঠন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উচ্চশিক্ষায় নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থানও সুদৃঢ় করেছে তারা। বিপরীতে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অর্জনে অনন্য হলেও গবেষণা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি।

আরও