গ্রামাঞ্চলের প্রতি তিন কিশোরীর দুজন মাসিকজনিত সমস্যায় ভোগে: আইসিডিডিআর,বি

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশ অন্তত একটি মাসিকজনিত সমস্যার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে পাওয়া গেছে। প্রতি তিনজনের একজন গবেষণাকালীন সময়ে তিন বা তার বেশি বার তীব্র ব্যথার মুখোমুখি হয়েছে এবং ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিত এ সমস্যায় ভুগেছে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে দুজন বিভিন্ন ধরনের মাসিকজনিত সমস্যায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথার কারণে তাদের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি স্কুলেও অনুপস্থিত থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম (এইচডিএসএস)-এর আওতায় ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ২৪ মাস ধরে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি চার মাস অন্তর অংশগ্রহণকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশ অন্তত একটি মাসিকজনিত সমস্যার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে পাওয়া গেছে। প্রতি তিনজনের একজন গবেষণাকালীন সময়ে তিন বা তার বেশি বার তীব্র ব্যথার মুখোমুখি হয়েছে এবং ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিত এ সমস্যায় ভুগেছে।

গবেষণায় অংশ নেয়া প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরী জানিয়েছে, মাসিকের ব্যথার কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া প্রতি চারজনের প্রায় একজন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র ব্যথার কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। নিয়মিত মাসিকের ব্যথায় আক্রান্ত কিশোরীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ অন্য শারীরিক জটিলতারও সম্মুখীন হয়েছে।

সেমিনারে উপস্থাপিত আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ীর ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি কিশোর (৩৪ শতাংশ) জানত না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর একজন মেয়ে গর্ভধারণ করতে পারে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৬ শতাংশ।

এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও সীমিত ধারণা পাওয়া গেছে। যেখানে ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে জানে, সেখানে কিশোরীদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। একইভাবে, ৩৮ শতাংশ কিশোর জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সম্পর্কে জানলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে জ্ঞান থাকা মেয়েদের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার অন্যদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। যেসব মেয়ের এ বিষয়ে ধারণা ছিল, তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ৫ শতাংশ; আর যাদের ধারণা ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে তা ছিল ১০ শতাংশ।

পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে প্রায় ২০০ জন কিশোরীর বিয়ে হয় এবং ৭২ জন গর্ভবতী হয়। গবেষকরা বলছেন, এসব তথ্য বিয়ের আগেই কিশোর-কিশোরীদের সঠিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য করতে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত অ্যাডসার্চের দুটি উদ্ভাবনী উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে স্মার্টফোনভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রকল্প এবং বাংলা ভাষার বিনামূল্যের মোবাইল অ্যাপ ‘কৈশোর কথা’ উল্লেখযোগ্য।

আইসিডিডিআর,বি’র বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটির কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা মাসিক নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং বিয়ের আগেই পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক তথ্য কিশোর-কিশোরীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট-হেলথ) এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করতে কানাডার চলমান সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন।

গবেষকদের মতে, কিশোর-কিশোরীদের জন্য মাসিককালীন সহায়তা, প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য এবং কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন, যাতে তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।

আরও