ব্যাংকিং খাত

অবয়ব বেড়েছে অন্তর্ভুক্তি বাড়েনি

১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাই ১১ কোটি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ বাড়িয়ে চলেছে ব্যাংকগুলো। যদিও বাড়েনি জনগণকে ধার দেয়ার প্রবণতা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা না বেড়ে, উল্টো কমেছে।

১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাই ১১ কোটি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ বাড়িয়ে চলেছে ব্যাংকগুলো। যদিও বাড়েনি জনগণকে ধার দেয়ার প্রবণতা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণগ্রহীতার হার না বেড়ে, উল্টো কমেছে।

সরকারের তৈরি করা ‘ন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন স্ট্র্যাটেজি-বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯ দশমিক ১ শতাংশেরই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবধারী ছিল। ২০১৭ সালে এ হার ৪১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। হিসাব সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেড়েছে সঞ্চয়কারীর হারও। ২০১৪ সালে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৪ শতাংশের সঞ্চয় থাকলেও ২০১৭ সালে তা ৯ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। হিসাবধারী ও সঞ্চয়কারী বাড়লেও এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণগ্রহীতার হার না বেড়ে উল্টো কমেছে। ২০১৪ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণগ্রহীতার হার (ক্রেডিট কার্ডসহ) ছিল ১০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে। শাখা-প্রশাখা বেড়ে বড় হয়েছে ব্যাংকগুলোর অবয়বও। ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে হিসাবধারীর সংখ্যাও বেড়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের অর্থ অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত হয়েছে ঠিকই, বিপরীতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। উল্টো গ্রামাঞ্চলের অর্থ রাজধানীতে এসে সম্পদ আরো কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে।

কৃষক শ্রেণীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার জন্য ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি চালু হয় ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব চালু করা হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হয় স্কুল ব্যাংকিং। পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষদের জন্যও ব্যাংক হিসাব চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকে শুধু কৃষকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাই এক কোটি ছাড়িয়েছে। ২০১৯ সালের জুন শেষে কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৬ হাজার ৯০৭। কৃষকসহ অন্যান্য বিশেষ সুবিধাযুক্ত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৯৪ লাখ ৯৮ হাজারে উন্নীত হয়েছে। বিশালসংখ্যক এসব ব্যাংক হিসাবে পুঞ্জীভূত মোট জমার পরিমাণ ১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। তবে বিশেষ এ ব্যাংক হিসাবগুলোর মাধ্যমে ঠিক কত টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বিদায়ী বছরের জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৩০টি। এসব ব্যাংক হিসাবে মোট ১ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা জমা হয়েছে। যদিও স্কুল ব্যাংকিং হিসাবগুলো প্রকৃত অর্থেই শুধু শিক্ষার্থীদের কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রত্ব শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও এখনো স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে লেনদেন করছেন।

পথশিশুদের সঞ্চয়ের জন্য চালু করা হয়েছিল বিশেষ ব্যাংক হিসাব। এ ধরনের হিসাবের সংখ্যাও ৫ হাজার ১৪৭টি। ব্যাংক হিসাবগুলোতে পথশিশুরা ৩৭ লাখ টাকার আমানত রাখলেও কোনো ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনো পথশিশুকে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করার নজির নেই।

কোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা তার হিসাবে আমানত জমা করাকেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আসা বলে মনে করেন না এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। তার মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মানে গ্রাহকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা। কেবল ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের হিসাব খোলা কিংবা তাদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বলা যায় না। বরং হিসাবধারী গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করাই ব্যাংকের মৌলিক কাজ। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে আমানত সংগ্রহ করলেও সেখানে ব্যাংক ঋণ পৌঁছাচ্ছে না বলে জানান এ ব্যাংকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদায়ী বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় আমানতের হিসাব সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৯৬। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩১ কোটি টাকার আমানত। আমানতের মধ্যে ৯ লাখ ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা ছিল শহরাঞ্চলের। বাকি ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩১১ কোটি টাকা গ্রামাঞ্চলে থাকা ব্যাংকের শাখাগুলো সংগ্রহ করেছে। এ হিসেবে ব্যাংক আমানতের ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের।

একই সময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে এমন হিসাব সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৯। এসব হিসাবের বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি খাতে মোট ৯ লাখ ৫১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। বিতরণকৃত ঋণের ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকাই বিতরণ করা হয়েছে শহরাঞ্চলে, যা ব্যাংকঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর গ্রামাঞ্চলে থাকা শাখার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে ৯৮ হাজার ৮ কোটি টাকার ঋণ। সে হিসেবে মোট ব্যাংকঋণের মাত্র ১০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বিনিয়োগ হয়েছে। যেখানে ব্যাংক আমানতের প্রায় ২১ শতাংশের জোগান গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছে।

যেখান থেকে আমানত সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগের পরিস্থিতি নেই বলেই টাকা অন্যত্র স্থানান্তর হচ্ছে বলে জানান অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংকের মৌলিক কাজ হলো গ্রাহক থেকে টাকা নেয়া এবং গ্রাহকের প্রয়োজনে টাকা দেয়া। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ এলাকাতেই বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। এজন্যই গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে নেয়া আমানত অন্যত্র বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এতদিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ব্যাংক হিসাব ছিল না। এজেন্ট ব্যাংকিংসহ অন্যান্য সেবার মাধ্যমে মানুষ ব্যাংকে আসছে। তবে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মাঝেও ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকারদের কাজ করা উচিত।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসার জন্য চালু করা হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং। এখন পর্যন্ত দেশের ১৯টি ব্যাংক সেবাটি চালু করেছে। বিদায়ী বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে ৬ হাজার ১৩। একই সময়ে ৮ হাজার ৬৭১টি ব্যাংকিং আউটলেট চালু করা হয়েছে। আউটলেটগুলোর মাধ্যমে হিসাব খুলেছে ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৬৭২ জন গ্রাহক। এসব ব্যাংক হিসাবের ৮৩ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খোলা ব্যাংক হিসাবগুলোয় মোট ৫ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার আমানত জমা হয়েছে। বিশাল এ আমানতের বিপরীতে মাত্র ২৩৭ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। ১৯টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করলেও এখন পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে মাত্র সাতটি ব্যাংক। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া একাই এজেন্টের মাধ্যমে ২১১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। অর্থাৎ, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহকৃত আমানতের ৫ শতাংশও সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঋণ দেয়নি ব্যাংকগুলো।

শুরু থেকে পুরোদমে করপোরেট ব্যাংকিং করলেও এখন সে অবস্থা থেকে সরে এসেছে দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড। রিটেইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো কার্যক্রমে জোর দিয়ে সামনে এগোচ্ছে ব্যাংকটি। দেশের যে কয়টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দিচ্ছে, তার একটি সিটি ব্যাংক। বিদায়ী বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি এজেন্টের মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করছে। গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ বিতরণের দিক থেকে ব্যাংকিং খাতে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিদ্যমান মডেল নিয়ে হতাশ সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। তার মতে, আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার সমন্বয় হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বলা যায়। কিন্তু এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শুধুই আমানত সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোয় তারল্যের সংস্থান হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অর্থের আবর্তন (মোবিলাইজেশন) হচ্ছে না। ঋণ বিতরণ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি হবে না। বিকাশসহ অন্য মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো শুধুই মানিট্রান্সফারার হিসেবে কাজ করছে। পেমেন্টের জন্য পস মেশিনগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ পরিস্থিতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বলা যায় না। আবার ১১ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব থাকলেও সচল হিসাবের সংখ্যা ৫ কোটির বেশি হবে না।

আরও