খুলনায় মেসে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে আজমুল হোসেন নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার রাতে নগরীর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি চারতলা মেসে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ২১ বছর বয়সী আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগমের ছেলে। তিনি খুলনা নগরীর বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানান, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তেমন কিছু জানে না। তারা আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দুই পা ভাঙা ছিল।
হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহত আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা করা যায়, আমরা তাই করব।’
স্থানীয়রা জানান, ইসলামনগর রোডের ওই চারতলা ভবন পুরোটা ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০-৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। চারতলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী।
মেসের ছাত্রদের বরাতে স্থানীয়রা জানায়, গত শুক্রবার রাতে মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেহেদীসহ মেসের ও বহিরাগত কয়েকজন তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন। ছাদ থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান আশপাশের বাসিন্দারা। পরে তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর খবর জানার পর মেসের ছাত্ররা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
মেসের বুয়া ফাতেমার দাবি, আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগেও টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ ছিল। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে মারধর করেন। তিনি নিষেধ করলেও তারা শোনেননি। পরে তিনি জানতে পারেন, আজমুল মারা গেছেন।
মেসের পেছনের ভবনের এক নারী বাসিন্দা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। দরজা খুলে বাইরে এসে দেখেন, বাড়ির সামনে গলিতে একটি ছেলে পড়ে আছে। পরে মেসের ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমুল। এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য বাড়ি থেকে খুলনায় আসে। গত বছর ও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়। শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে ফোনে তাদের সঙ্গে আজমুলের শেষ কথা হয়। তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে কল দেয়। সে বলে—আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না। তখন আমি বলি—আমরা গরিব মানুষ, ১ লাখ টাকা কোথায় পাব? তখন সে বলে, আপনি কী করেন? আমি তাকে বলি, আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। সকালে এসে দেখি আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’
কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’
গত ১৭ আগস্ট শিশু অপহরণকারী সন্দেহে মো. রাজু (২৬) নামে এক যুবককে ও ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর কুয়েট রোডে চুরির অভিযোগে সাজমীর (২৪) নামে আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে গত দুই মাসে খুলনা নগরীতে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠল।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন জানান, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই সেখানে সরাসরি আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে আমরা ঘটনাটি জানার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।