বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় বিপিডিবিকে

দেশের সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

এ বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বাল্ক বা পাইকারি সরবরাহ করতে প্রতি ইউনিটে ভর্তুকি ছাড়া ব্যয় হয় ১৩ টাকা ৯ পয়সা। যেখানে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ১২ পয়সা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে বিপিডিবি। অর্থাৎ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুৎ পাইকারি পর্যায়ে বিক্রিতে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেয়া বিপিডিবির প্রস্তাব ও বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটির তথ্য-উপাত্ত থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

ক্যাপাসিটি চার্জ-বিষয়ক চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোম্পানিগুলোকে দিতে বাধ্য থাকে। মূলত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং পরিচালনার খরচ মেটাতেই এ চার্জ দেয়া হয়।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আমদানি বিদ্যুৎ মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ক্রয়ের প্রাক্কলন রয়েছে বিপিডিবির। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্রয়ে মোট ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ চার্জের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।

দেশে বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের পর থেকে একের পর এক আইপিপি, রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সময়ের ব্যবধানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে থাকলেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো যায়নি। এতে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় বিপিডিবিকে।

বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বিপিডিবির প্রতি ইউনিটে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা (গড়)। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি এ ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় গিয়ে দাঁড়ায়। ১৪ বছরের ব্যবধানে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ ইউনিটপ্রতি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ গত বছরের চেয়ে কিছুটা কমার প্রাক্কলন করলেও আগামী অর্থবছরে পুনরায় এ চার্জ বাড়বে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষ আইন ব্যবহার করে একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো ধরনের জ্বালানির সংস্থান না করে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। আর এ অর্থের ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। এভাবে দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। বরং এ খাতে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। সেই সঙ্গে অব্যবহৃত ও অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন সক্ষমতা থেকে বাদ দিয়ে প্রকৃত সক্ষমতা নিরূপণ করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারায় ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ছে। এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। কোনো ধরনের উৎপাদন ছাড়াই এসব কেন্দ্রকে বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল। এ অব্যবহৃত সক্ষমতার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। এটা হয়েছে মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অবসরে দিতে হবে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো জ্বালানি নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহার করতে হবে। এটা আসলে অপারেশনালগত সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত ঠিকমতো নেয়া না গেলে ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়তেই থাকবে। ফলে একটা কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান নিয়ে এগোতে হবে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি কমাতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে বিপিডিবির পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিট পর্যায়ে ভারিত গড় ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৮ পয়সা করা হয়েছে। প্রতি ইউনিটের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। ভর্তুকির অর্থ বাদ দিলে প্রতি ইউনিটে বিপিডিবির প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহ বাবদ ব্যয় ১৩ টাকা ৯ পয়সা।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর বিপিডিবির অতিরিক্ত অর্থ আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। এর বাইরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আরো প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিতে হবে।

বিপিডিবির তথ্যমতে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত দেড় দশকে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জের হিসাব ধরলে অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জও বেড়েছে। যদিও এ সময় বেশির ভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হয়নি। কিছু কেন্দ্র বছরে সক্ষমতার ২-৩ শতাংশ উৎপাদন করেছে। তবে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হবে, এমন শর্তেই চুক্তির সময় ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

দেশের সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বেসরকারি ও আমদানিনির্ভর কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যদিও স্থানীয় সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পর্যাপ্ত জ্বালানির সংস্থান না থাকাও একটা বাস্তবতা বলে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিইআরসির তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা গেছে, দেশের বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ কেনা হবে, তার ক্যাপাসিটি চার্জ ১৯ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এর বাইরে ভারতের সরকারি ও আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ রয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে অন্তত ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এ ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে পুনরায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানিতে ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের সমালোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা। এর পরও বিপিডিবির পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে কমিশন। জানা গেছে, এমন পরিস্থিতির পর ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি যৌক্তিক হারে কমানোর বিষয়ে কাজ করছে বিপিডিবি।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি কেন্দ্রগুলো পর্যালোচনা (রিভিউ) করে ক্যাপাসিটি চার্জ এরই মধ্যে কমিয়ে আনা হয়েছে। বেসরকারি অনেকগুলো কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবি নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া জয়েন্ট ভেঞ্চার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর রিটার্ন অন ইকুইটির (মূলধনের বিপরীতে আয়) বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও দূতাবাসগুলোতে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিপিডিবি ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে সব পক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।’

আরও