বিদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে যাত্রীকে ঢাকায় নিয়ে এলেও লাগেজ ফেলে আসা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছিল বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর ক্ষেত্রে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বল্প মূল্যে (লো কস্ট ক্যারিয়ার) আসা ফ্লাইটগুলোর যাত্রীরাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ না পাওয়ার অভিযোগগুলো করতেন। একসময় প্রায় প্রতি ফ্লাইটেই ৩০-৫০ যাত্রীর বেলায় এমন ঘটনা ঘটতে থাকে। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অভিযুক্ত এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি কমানোর পাশাপাশি আসনসীমা বেঁধে দেয়ার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এতে ফলও দিয়েছে বেশ, বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর লাগেজ লেফট বিহাইন্ড বা যাত্রীর সঙ্গে তার লাগেজ নির্ধারিত গন্তব্যে না পৌঁছনোর ঘটনা নেমে এসেছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশে।
একটি উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ার ক্ষেত্রে ভার বহনের সক্ষমতা নির্ধারিত। উড়োজাহাজের ওজন, যাত্রীদের ওজন, লাগেজের ওজন, জ্বালানির ওজন—সব সমন্বয় করে আকাশে ওড়ার জন্য নির্ধারিত ওজন ঠিক রেখে ফ্লাইটের প্রস্তুতি নেয়া হয়। তবে এর তারতম্য হলেই এয়ারলাইনসগুলো যাত্রী আনলেও লাগেজ রেখে আসে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, লাগেজ লেফট বিহাইন্ড হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছিল ছুটিতে আসা প্রবাসী কর্মীদের। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোকে চিঠি দেয় বেবিচক। চার ধরনের শাস্তির বিষয় উল্লেখ করে সেই চিঠিতে বলা হয়, যেসব এয়ারলাইনস যাত্রীর লাগেজ লেফট বিহাইন্ড বন্ধ করতে পারবে না, শাস্তি হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সাপ্তাহিক ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া ন্যারো বড়ির উড়োজাহাজ ব্যবহার করে যেসব এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে, তাদের ক্ষেত্রে বেঁধে দেয়া হয় আসনসীমা। অর্থাৎ ২১০ আসনের ন্যারো বডির উড়োজাহাজ দিয়ে যেসব এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে, তাদের প্রতি ফ্লাইটে ২০টি করে আসন ফাঁকা রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়। এতেও যদি লাগেজ লেফট বিহাইন্ড বন্ধ না হয় সেক্ষেত্রে লাগেজ প্রতি ক্ষতিপূরণ এবং এয়ারলাইনসকে আর্থিকভাবে জরিমানা করার বিষয়টিও উল্লেখ করে বেবিচক।
জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জাজিরা এয়ারওয়েজ, সালাম এয়ার, কাতার এয়ারওয়েজ, সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস, এমিরেটস, ইতিহাদ, ফ্লাই দুবাই, এয়ার অ্যারাবিয়া, ওমান এয়ার, গালফ এয়ার, কুয়েত এয়ারওয়েজের ক্ষেত্রে ব্যাগেজ লেফট বিহাইন্ড বেশি হচ্ছিল। তাই এটি বন্ধে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে গত জুন থেকে কয়েক দফা বৈঠক করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এয়ার অ্যারাবিয়া, জাজিরা এয়ারওয়েজ ও সালাম এয়ারের নির্দিষ্ট মেয়াদে ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে দেয়া হয়। ফ্লাইটপ্রতি ২০ যাত্রী কম আনতে আসনসীমা বেঁধে দেয়া হয় এয়ার অ্যারাবিয়াকে। আবার কয়েকটি এয়ারলাইন নিজ উদ্যোগেই ফ্লাইটপ্রতি ২০-৩০টি আসন ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এয়ারলাইনসগুলোর ব্যাগেজ লেফট-বিহাইন্ড নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়।
এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে ৩১টি এয়ারলাইন শাহজালাল বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এগুলোর ফ্লাইটে দৈনিক প্রায় ২২ হাজার যাত্রী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বিদেশ থেকে আসা অনেক যাত্রীর লাগেজ না পাওয়ার ভোগান্তি দূর করতে নিয়মিতভাবেই বিদেশী এয়ারলাইনসের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে, যার সুফল এরই মধ্যে দৃশ্যমান। তিনি আরো বলেন, কার্যক্রম পরিচালনাকারী ২৮টি বিদেশী এয়ারলাইনসই প্রতি সপ্তাহে লাগেজ ডেলিভারির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আমাদের দিচ্ছে। বর্তমানে লেফট বিহাইন্ড কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশে।
সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, এয়ারলাইনসগুলোর অনিচ্ছাকৃত কারণেও অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীর লাগেজ লেফট বিহাইন্ড হয়। বিশেষ করে ট্রানজিট যাত্রীর ক্ষেত্রে দুই ফ্লাইটের মধ্যবর্তী সময় যদি কম হয় সেক্ষেত্রে লাগেজ ছাড়াই যাত্রী নিয়ে আসে এয়ারলাইনসগুলো। সেক্ষেত্রে পরবর্তী ফ্লাইটে ওই যাত্রীর লাগেজ আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া হঠাৎ করে আবহাওয়া খারাপ হলেও অতিরিক্ত জ্বালানি নিতে গিয়ে কিছু যাত্রীর লাগেজ রেখে আসতে বাধ্য হয় এয়ারলাইনসগুলো। সেই সঙ্গে কারিগরি ত্রুটি, মিস হ্যান্ডলিং, ভুল ট্যাগিংসহ নানা কারণে লাগেজ লেফট বিহাইন্ড হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাত্রীর লোড ফ্যাক্টর ম্যানেজ করতে স্বেচ্ছায় লাগেজ লেফট বিহাইন্ড করে এয়ারলাইনসগুলো।