গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সমাজগুলো প্রায়ই তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন, ক্রমবর্ধমান অপরাধ, সংস্কার থেকে পিছু হটা, দুর্নীতি এবং নাগরিকদের মধ্যে মোহভঙ্গের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। শাসন ব্যবস্থা উদারীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আদর্শিক মেরুকরণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থার অভাব রাজনীতিকে অস্থিরতা ও কর্তৃত্বপরায়ণতার চক্রে আবদ্ধ করে রাখে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ তিউনিসিয়া ও মিসর। আরব বসন্তের পর দেশ দুটোতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবতা বিপরীত। মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুড ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। ২০১২ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তার ইসলামপন্থী নীতি ধর্মনিরপেক্ষ দল, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের বিরাগভাজন হয়। ২০১৩ সালে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তিউনিসিয়ায় জাইন আবেদিন বেন আলির পতনের পর ইসলামপন্থী এন্নাহদা ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর মধ্যে সংবিধান ও শাসন নিয়ে তীব্র আদর্শিক সংঘাত দেখা দেয়, যা দেশটিকে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যায়। ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেটের মধ্যস্থতায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও ২০১৪ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোয় ধর্মনিরপেক্ষ দল নিদা তিউনিস ও এন্নাহদার মধ্যে বারবার জোট গঠন ও ভাঙনের কারণে কোনো সরকারই পূর্ণ মেয়াদে টিকতে পারেনি। এ রাজনৈতিক বিভাজনের পটভূমিতেই ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ সংবিধান স্থগিত করে নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। মূলত কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনেই ফিরে যায় তিউনিসিয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তিউনিসিয়া ও মিসরের মাঝামাঝি একটি অনিশ্চিত উত্তরণের দোরগোড়ায় অবস্থান করছে বাংলাদেশ। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিউনিসিয়া ও মিসরে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, গভীর আস্থাহীনতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে টানাপড়েন গণতান্ত্রিক উত্তরণের সম্ভাবনাকে যেভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল, বাংলাদেশেও তার কাছাকাছি চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপস্থাপনাকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এ সংকট দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
এ বিষয়ে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট যদি অ্যাকসেপ্ট না করে তাহলে সংলাপ করল কেন? সনদ স্বাক্ষরের সময় বলা হয়েছিল নোট অব ডিসেন্ট থাকবে। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে তা কেন গায়েব হলো? ঐকমত্য কমিশন অনৈক্য সৃষ্টি করছে কিনা সেটাই আমার প্রশ্ন। যেসব বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই সেসব বিষয় আদেশ জারি করে নোট অব ডিসেন্ট ইস্যুতে পরবর্তী সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। এটা নিয়ে যদি কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয় তাহলে অন্য পক্ষের হস্তক্ষেপের পথ সুগম হবে এটা সবাইকে বিবেচনায় আনতে হবে।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মতে, এটি বাস্তবায়নের আদেশ জারির এখতিয়ার সংবিধান অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। তার অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত, ভিন্নমত ও নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ করা হয়নি, যা দীর্ঘ এক বছরের ধারাবাহিক আলোচনাকে অর্থহীন করার পাশাপাশি প্রহসনমূলক এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। অন্যদিকে নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের জানিয়েছেন, কমিশনের সুপারিশের আলোকে অবিলম্বে আমরা সরকারি আদেশ চাই। আমরা জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট চাই। গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাই।
রাজনীতিতে এমন বিরোধ বাংলাদেশকে তিউনিসিয়া বা মিসরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের দিকে যাবে না। এ ধরনের শঙ্কা আমরা দেখি না। বাংলাদেশ কেন তিউনিসিয়ার দিকে যাবে? বাংলাদেশ বাংলাদেশের দিকে থাকবে। আমরা চাই নির্বাচন হোক। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের জন্য যে সময় নির্ধারণ করে রেখেছে ওই সময়ই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।’
গণভোটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণভোট ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা কোনো ব্যাপারই না। কারণ গণভোটে কোনো প্রার্থী কিংবা প্রতীক নেই। বহু ধরনের ব্যালট ছাপতে হবে না। শুধু “হ্যাঁ-না”। খুব সহজ একটি প্রক্রিয়া। একটি তারিখ নির্ধারণ করবে। গণভোটের বিষয়গুলো নিয়ে দলগুলো জনগণের কাছে যাবে। সেটি ১৫ দিন থেকে শুরু করে ২৫ দিনের মাথায় করা সম্ভব।’
তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিভাজন শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে দুর্বল করে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন ব্যবস্থাকে ফের শক্তিশালী করেছে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে একাধিক আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষণে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের বিপ্লবের পর তিউনিসিয়ার রাজনীতিতে প্রধান সমস্যা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে ব্যর্থতা ও স্থায়ী মতাদর্শিক বিভাজন ও সিদ্ধান্তহীনতা। বিপ্লবের পর টানা এক দশক বারবার সরকার বদল জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করে। মূলত সুশাসনের অভাবই প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ তৈরি করে।
মিসরে জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল-সিসির ক্ষমতা গ্রহণ ছিল ২০১১ সালের আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সরাসরি ফল। হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনা তৈরি হলেও ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুড এবং ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো সেই সুযোগকে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে রূপ দিতে পারেনি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মুরসি নেতৃত্বাধীন ব্রাদারহুড তাদের বিপুল জনসমর্থনকে রাজনৈতিক আধিপত্যে পরিণত করতে চেয়েছিল। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তারা বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। সংবিধান সংশোধনের নামে মুরসি যখন প্রেসিডেন্টের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা নেন এবং বিরোধীদের দমন শুরু করেন, তখন দেশের রাজনীতি চরম বিভাজনে পড়ে। ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। ২০১৩ সালের জুনে ‘তামারোদ’ নামের আন্দোলনে লাখো মানুষ রাস্তায় নামে, মুরসির পদত্যাগের দাবি ওঠে। সেক্যুলার দলগুলো গণতন্ত্রের নীতি রক্ষা না করে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। এ অবস্থায় সেনাপ্রধান আবদেল ফাতাহ আল-সিসি নিজেকে ‘রাষ্ট্রের স্থিতি রক্ষাকারী’ শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরে সেনাবাহিনী মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সংবিধান স্থগিত করে। বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিপক্বতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অভাবই মিসরের গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়, ফলে দৃশ্যপটে আসেন জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল-সিসি।
রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে তিউনিসিয়া বা মিসরের মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মতাদর্শিক বিভাজনটা নতুন নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর পরই এটা শুরু হয়েছিল। এখন যা দেখছি, তা হলো পুরনো বিভাজনের ভেতরেই একের পর এক উপবিভাজন তৈরি হচ্ছে। এখন আমরা রেড লাইনে পৌঁছে গেছি। বিভাজন দীর্ঘমেয়াদের দিকে এগোচ্ছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্র পরোক্ষভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।’
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যে অবস্থানে ছিল সেখান থেকে উল্টোদিকে বহুদূর সরে এসেছে বলেও জানান তিনি। আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘এর দায় সরকার এড়াতে পারে না। তাদের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই আমাদের এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমার আশঙ্কা, এ বিভাজন সমাধান হবে না; নির্বাচন হলেও হবে না। বরং নির্বাচনের পরের এক-দুই বছরে কলহ আরো বাড়তে পারে। সেটা হলে অনিশ্চয়তা আরো ঘনীভূত হবে। নানা ধরনের হস্তক্ষেপ দেখা দেয়ার আশঙ্কাও প্রবল।’
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সুপারিশকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার বা কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের তিনটি বিষয়ের মধ্যে একটি হলো সংস্কার। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জনগণের সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বহুলাংশে পূরণ হবে। ফলে সরকারের নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথটাও সুগম হবে। তাই সনদের সুপারিশকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার কোনো রকম সম্ভাবনা আমি দেখি না, কারণ গণভোট আর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের দুটি অগ্রাধিকার পূরণ হবে। তবে গণভোট কখন হবে, নির্বাচনের দিনে না তার আগে—তা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ওপর। তাই গণভোটের তারিখ সম্পর্কে সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’