রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় পাবনার রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কয়েকটি রাশিয়ান ব্যাংককে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে নিষিদ্ধ করায় সংকটে পড়েছে এটির নির্মাণ কার্যক্রম। চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ অগ্রিম হিসেবে রাশিয়ায় পাঠানো ত্রৈমাসিক কিস্তির অর্থ পরিশোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে এ সংকট। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে রাশিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের স্বাক্ষরিত চুক্তি পরিবর্তন করতে চায় রাশিয়া।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট সম্প্রতি চিঠি দিয়ে তাদের নির্ধারিত ব্যাংক স্টেট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের ওপর চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সুইফট মাধ্যমে অর্থ লেনদেনে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি অবহিত করে। এ অবস্থায় অগ্রিম পরিশোধ বিষয়ে জেনারেল কন্ট্রাক্টের ৪.২ ধারার প্যারা-৫ সংশোধন করে এডিশনাল এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের অনুরোধ জানিয়েছে তারা। এ বিষয়ে চুক্তি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয় জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। তাদের প্রস্তাব এখন থেকে ত্রৈমাসিক কিস্তির অর্থ রাশিয়ায় পাঠানোর পরিবর্তে বাংলাদেশে তাদের ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা দেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। আর জেএসসি প্রয়োজন অনুযায়ী ওই অর্থ তুলে বাংলাদেশেই বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় করবে।
জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল হাসান এনডিসির সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটির জেনারেল কন্ট্রাক্টে ৪৬ নং ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (কাস্টমার) ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এবং জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (ঠিকাদার) ব্যাংক হিসেবে স্টেট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন নির্ধারিত। এ দুটি ব্যাংকের মধ্যে স্বাক্ষরিত আন্তঃব্যাংক সমঝোতা চুক্তির আওতায় চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের দেয়া ৯০ শতাংশ ঋণসহায়তা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ১০ শতাংশ অগ্রিম বাবদ জেএসসিকে ২২ কিস্তির মাধ্যমে ১০৭ কোটি ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। জেনারেল কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী, আগামী ২০২২-২৪ পর্যন্ত আরো ১০টি কিস্তিতে মোট ১৯ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। তবে সুইফটের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের স্বাক্ষরিত চুক্তি পরিবর্তন করে এডিশনাল এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের অনুরোধ জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার কথা রয়েছে। এটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
রাশিয়ার যেসব ব্যাংক কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে সেগুলোর একটি হলো ব্যাংক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফরেন ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স (ভিইবি)। ভিইবি বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নে রাশিয়া প্রান্তের এজেন্ট। তাদের মাধ্যমেই বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক এ প্রকল্পের অর্থ লেনদেন করে। মোট খরচের ৯০ শতাংশ ঋণসহায়তা হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। বাকি ১০ শতাংশ অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। রাশিয়া যে ঋণসহায়তা দিচ্ছে তা প্রকল্পের যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যয় করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ সরকার যে অর্থ দিচ্ছে, তা ব্যয় হচ্ছে রাশিয়ান প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, নির্মাণ শ্রমিক ও স্থানীয় শ্রমিকদের বেতন-ভাতায়।
বাংলাদেশ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণ ঠিকাদার জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টকে টাকা পাঠাত। অর্থের একটি অংশ রূপপুর প্রকল্প সাইটে কর্মরত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাবকন্ট্রাক্টরদের বিল আকারে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরে আসে। এ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের অর্থ জানুয়ারিতে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক ৩০ এপ্রিলের মধ্যে পাঠানোর কথা রয়েছে।