দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬ অস্ত্র

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো আবার সচল হয়েছে। স্বাভাবিক হয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু সেই সময় পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্রের এখনো হদিস মেলেনি।

অস্ত্রগুলো কার হাতে, কোথায় আছে কিংবা কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা সে তথ্যও নেই পুলিশের কাছে। রাষ্ট্রীয় এসব অস্ত্রের অবস্থান অজানা থাকায় তা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন এবং তার আগের দিন দেশজুড়ে পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ছিল সাবমেশিনগান, এসএমজি, চায়না রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্র। এর মধ্যে এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩২৬টি। পাশাপাশি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫টি গুলি উদ্ধার করা যায়নি। অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন থানার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও আলামতও ধ্বংস হয়ে যায়। রাজধানীর ছয়টি থানায় পুড়ে যায় ১ হাজার ২২৬টি মামলার নথি। মিরপুর মডেল থানায় ধ্বংস হয় ৬৬০টি মামলার ফাইল এবং মালখানায় থাকা ২৩০টি আলামত। যাত্রাবাড়ী থানায় পুড়ে যাওয়া নথি ও জব্দকৃত আলামতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব আজও সম্পন্ন হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং আলামত নষ্ট হওয়ায় বহু মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এখনো উদ্ধার না হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র আইন-শৃঙ্খলার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্রের একটি অংশ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে চলে গেছে এবং ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মতে, খোয়া যাওয়া অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এরই মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যেগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো উদ্ধারে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সবশেষ গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার একটি পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে জেলের জালে উঠে আসে পুলিশের একটি শটগান। আড়াইহাজার থানার অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এসআই শফিউল ইসলাম অস্ত্রের রেজিস্টার যাচাই করে নিশ্চিত করেন, উদ্ধার হওয়া শটগানটি আড়াইহাজার থানার পুলিশের এবং এর বাঁট নম্বর ৬৫১। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহারের নজিরও রয়েছে। গত বছরের ২১ জুলাই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে জামিনে থাকা ‘সন্ত্রাসী’ ইসমাইল হোসেন ওরফে টেম্পো ও শহিদুল ইসলাম ওরফে বুইসার বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় কেউ হতাহত হননি। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকায় সন্ত্রাসী শহিদুল ইসলামের একটি আস্তানার সন্ধান পায়। সেখানে থানা থেকে লুট হওয়া দুটি গুলি ও গুলির খোসা পাওয়া গেছে। এর এক মাস পর গত বছরের ২৯ আগস্ট নগরের বায়েজিদ-হাটহাজারী থানার সীমানাসংলগ্ন কুয়াইশ এলাকায় মাসুদ কায়সার ও মো. আনিসকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ পাঁচটি গুলির খোসা (শটগানের কার্তুজ) উদ্ধার করে, যা থানা থেকে লুট করা গুলির বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় অস্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের হাতে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপরাধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা সংঘবদ্ধ সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে। শুধু নিয়মিত অভিযান নয়; গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক বিশেষ অভিযান, অস্ত্রের কালোবাজার চিহ্নিতকরণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে পুলিশকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শাসনামলে সে অভিযোগ আরো প্রকট হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা, গ্রেফতার অভিযান, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, ভিন্নমত দমনের সমালোচনা এবং দুর্নীতির নানা ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই-আগস্টজুড়ে আন্দোলন দমনে সবচেয়ে বেশি মাঠে ছিল পুলিশ। অন্য বাহিনীগুলো পরে যুক্ত হলেও শুরু থেকে সংঘাতের সামনের সারিতে ছিল পুলিশ। তবে মানুষের ক্ষোভ কেবল ওই সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, বিরোধী মত দমনে পুলিশের ভূমিকা, হয়রানি এবং নির্যাতনের অভিযোগ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিস্ফোরিত হয়। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশকে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হলে জবাবদিহিমূলক, নিরপেক্ষ ও সেবামুখী বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করতে হবে।’

খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পাশাপাশি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারেও পুলিশ বাহিনীকে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান। তাই বাহিনীর কয়েকজন সদস্য বা কর্মকর্তার অপরাধের দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপানো ঠিক হবে না। তবে এটাও সত্য, গত দেড় দশকে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক পক্ষপাত, গুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও দুর্নীতির মতো ঘটনায় জড়িত কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। সেখান থেকেই পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি এ সময় বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করতে হবে।’

আরও