হেমায়েতপুর-ভাটারা মেট্রোরেল প্রকল্প

তৃতীয় মেট্রোর নির্মাণকাজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

সাভারের হেমায়েতপুরে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কচুক্ষেত, বনানী, নতুনবাজার ও ভাটারার মধ্যে হবে ঢাকার তৃতীয় মেট্রোরেল রুট (এমআরটি লাইন-৫, নর্দার্ন রুট)। ১৬ সেপ্টেম্বর মেট্রোর এ লাইনের নির্মাণকাজ শুরুর কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ‘শিডিউল’ না পাওয়ায় নির্মাণকাজের উদ্বোধন আপাতত স্থগিত রেখেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। তবে প্রধানমন্ত্রীর শিডিউল নিয়ে দ্রুত কাজ শুরুর আশাবাদ

সাভারের হেমায়েতপুরে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কচুক্ষেত, বনানী, নতুনবাজার ও ভাটারার মধ্যে হবে ঢাকার তৃতীয় মেট্রোরেল রুট (এমআরটি লাইন-৫, নর্দার্ন রুট)। ১৬ সেপ্টেম্বর মেট্রোর এ লাইনের নির্মাণকাজ শুরুর কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ‘শিডিউল’ না পাওয়ায় নির্মাণকাজের উদ্বোধন আপাতত স্থগিত রেখেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। তবে প্রধানমন্ত্রীর শিডিউল নিয়ে দ্রুত কাজ শুরুর আশাবাদ জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা। 

মেট্রোটির গতিপথে পড়েছে দেশের ব্যস্ততম ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের (এন-৫) হেমায়েতপুর-গাবতলী অংশ। মহাসড়কটিতে বর্তমানে সম্প্রসারণ, সার্ভিস লেন, বাস-বে নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এতে খরচ হচ্ছে ৬৯৬ কোটি টাকার বেশি। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বলছেন, এমআরটি-৫, নর্দার্ন রুটের নির্মাণকাজ শুরু হলে সদ্য উন্নয়নকৃত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর-গাবতলী অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

নকশা অনুযায়ী হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত এলাকায় এমআরটি-৫, নর্দার্ন রুটের উড়ালপথ (এলিভেটেড) তৈরি করা হবে। আর আমিনবাজার থেকে গাবতলী পর্যন্ত মেট্রোটি হবে পাতালপথে (আন্ডারগ্রাউন্ড)। উড়ালপথের জন্য যেসব পিলার তৈরি করা হবে, সেগুলোর পাইলিংয়ের জন্য সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন হবে। এসব কাজ করতে গিয়ে সদ্য সম্প্রসারণ করা মহাসড়কটি ক্ষতির মুখে পড়বে। অন্যদিকে আমিনবাজার আর গাবতলী এলাকায় নির্মাণ হবে মেট্রোরেলের দুটি পাতাল স্টেশন। এ দুই স্টেশন নির্মাণকাজের কারণেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। 

মহাসড়কটির সম্প্রসারণকাজ করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন সংস্থা সওজ অধিদপ্তর। আর মেট্রোরেল নির্মাণ করছে একই বিভাগের অধীন সংস্থা ডিএমটিসিএল। মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের জন্য সদ্য উন্নয়নকাজ করা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেজন্য একই বিভাগের দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা এতে কোনো সমন্বয়হীনতা দেখছেন না। তারা বলছেন, একেক প্রকল্পের ধরন একেক রকম। প্রকল্পগুলো অনুমোদন ও বাস্তবায়নও ভিন্ন সময়ে হচ্ছে। মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য সড়কের যা ক্ষতি হবে, তা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয়ার কথা জানিয়েছেন মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা। 

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে উন্নয়নকাজ করা হচ্ছে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘‌ঢাকা (মিরপুর)-উথুলী-পাটুরিয়া জাতীয় মহাসড়ক (এন-৫)-এর নবীনগর থেকে নয়ারহাট এবং পাটুরিয়াঘাট এলাকা প্রশস্তকরণসহ আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিশেষায়িত লেনসহ সার্ভিস লেন ও বাস-বে নির্মাণ’ প্রকল্প। 

সরজমিন গতকাল গাবতলী-আমিনবাজার-হেমায়েতপুর এলাকা ঘুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলতে দেখা গেছে। গাবতলী ট্রাফিক মোড় এলাকায় সড়কটি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সার্ভিস লেন তৈরি করা হচ্ছে। আমিনবাজার সেতুর সমান্তরালে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন সেতু। আমিনবাজার এলাকায়ও সড়ক সম্প্রসারণ, বাস-বে, ফুটওভার ব্রিজসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। একই ধরনের কাজ চলতে দেখা গেছে হেমায়েতপুরেও। 

সওজ অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের উড়ালপথের পিলার ও স্টেশনের নির্মাণকাজ শুরু হলে মহাসড়কটির বিভিন্ন পয়েন্ট ক্ষতির মুখে পড়বে। হেমায়েতপুর মোড়ে মেট্রো স্টেশন ও ডিপো তৈরি করলে মহাসড়কটিতে একটি স্থায়ী প্রতিবন্ধক তৈরি হয়ে যাবে।’ 

এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটের প্রকল্প পরিচালক আফতাব হোসেন খান অবশ্য দাবি করছেন, মহাসড়কে মেট্রোরেল কোনো সমস্যা তৈরি করবে না। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সবকিছু “‍সলভ” করে ফেলেছি।’ 

মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলাকালে যেমন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর মেট্রোর অবকাঠামোর কারণে মহাসড়কটিতে যান চলাচল বিঘ্নিত হবে। এমন আশঙ্কা প্রকৌশলীদের। বিষয়টি উল্লেখ করে গত জুনে ঢাকা সড়ক বিভাগের একজন প্রকৌশলী বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত মতামত দেন। এতে বলা হয়, মহাসড়কের রাইট অব ওয়ের (রো) শেষ প্রান্ত থেকে ১০ মিটার দূরত্বে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ না করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এমআরটি লাইন-৫-এর প্রস্তাবিত গতিপথে অধিকাংশ স্থাপনা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান করবে। এসব অবকাঠামো যানবাহনচালকদের দৃষ্টিসীমাকে বাধাগ্রস্ত করে দুর্ঘটনা প্রবলভাবে বাড়াবে এবং মহাসড়কে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেবে। 

লিখিত মতামতে বলা হয়, এমআরটি লাইন মূলত শহর এলাকায় নির্মাণ হয়, যেখানে যানবাহনের গতি কম থাকে। কিন্তু ঢাকা-আরিচা জাতীয় মহাসড়কের মধ্য দিয়ে দ্রুতগামী আন্তঃজেলা যানবাহন চলাচল করে। ফলে এখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রবল। 

বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তার মতে, মেট্রোরেল ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার কারণে এ ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে। 

অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌পুরো পৃথিবীতে উন্নয়ন পরিকল্পনা হয় একটার সঙ্গে অন্যগুলোর সমন্বয় করে। কোথায় কখন কী হবে তারা আগেই যথাযথভাবে পরিকল্পনা করে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারের একই বিভাগের দুই সংস্থার কাজেই সমন্বয় নেই। মেট্রোরেল ও আরিচা মহাসড়কের উন্নয়নকাজ সমন্বিতভাবে করা হলে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যেমন যথাযথভাবে হতো তেমনি নির্মাণকালে অপচয়ের শঙ্কাও তৈরি হতো না।’ 

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেছেন, ‘মেট্রোরেল নির্মাণকাজে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তা মেট্রোরেল প্রকল্পের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয়া হবে। উত্তরা-মতিঝিল রুটে মেট্রোরেল নির্মাণকাজের কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছে। পরে কিন্তু সেগুলো মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দিয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও এমনটি করা হবে। সওজ অধিদপ্তর ও ডিএমটিসিএলের মধ্যে সমন্বয় করেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

আরও