বিশ্বে যে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি অর্জন করেছে তাদের প্রত্যেকের উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার মানে ক্রমেই অবনমন ঘটেছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে এ অবনমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। নতুন ভবন, প্রকল্পের বাহুল্য থাকলেও সর্বস্তরে শিক্ষার গুণগত মান ছিল নিম্নগামী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সবার প্রত্যাশা ছিল, গণ-অভ্যুত্থানের সরকার শিক্ষা খাতকে সংস্কারের অগ্রাধিকারে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন খাতের সংস্কারে ১১টি কমিশন গঠন হলেও শিক্ষা খাতের জন্য কোনো কমিশন হয়নি। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একাডেমিক সংস্কারের জন্য বড় কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। এমনকি জুলাই সনদে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত। একদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত শিখনসামগ্রী ও পরিবেশ; শিক্ষকদের বেতনও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত গ্র্যাজুয়েট’। যাদের অধিকাংশের ডিগ্রি আছে কিন্তু দক্ষতা নেই। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বড় অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িত। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক বিপর্যয়কর অবস্থায় রয়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও গুণগত মানে তা হয়নি; বরং অবনতি হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত নানা ধাপে স্বজনপ্রীতি, ঘুস, রাজনৈতিক প্রভাব, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা-বহির্ভূত ভর্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা শিক্ষার মান অবনমনের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সব মিলিয়ে শিক্ষা খাত চরম বেহাল দশায় পতিত হয়। তাই সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি, বৈষম্য ও মান অবনমন মোকাবেলায় কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবে এবং যথাযথ সংস্কারে হাত দেবে। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে সে রকম কোনো সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের আঁতুড়ঘর ছিল মূলত শিক্ষাঙ্গনগুলো। সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে শিক্ষার্থীরাই। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা সংস্কারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিল না। একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন হলো না, সংস্কারের কোনো আলাপও নেই। জুলাই সনদেও শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি অনুপস্থিত। কেন শিক্ষা খাত সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ল, এর যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাই না। তারা বারবার বলছে দেশ পুনর্গঠন করা হচ্ছে; শিক্ষা খাত বাদ দিয়ে দেশ কী করে পুনর্গঠন সম্ভব? একটি দেশের উন্নতির প্রথম শর্তই হলো প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা। আমরা সেখানেই কিছু করলাম না। তাহলে সামনে এগোনো বা কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে হবে?’
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বহুস্তর ও অসামঞ্জস্যে জর্জরিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া নানা ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশ কীভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব? আসলে আমরা গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও একটা ফাঁকির মধ্যে থেকে গেলাম। এটি নীতিনির্ধারকের চরম উদাসীনতা ও রাষ্ট্র নিয়ে দূরদৃষ্টির অভাব ছাড়া আর কিছু নয়। এ খাতে সংস্কারের কোনো চিন্তাই তাদের ছিল না। মানুষ যে সরকারের কাছে পরিবর্তন চেয়েছে, সে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন—এটি অস্বাভাবিক।’
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দেখা যায়, একদিকে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে, অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে মান কমেছে। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের নামে আওয়ামী শাসনামলে দুটি বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, এ বিপুল অর্থ ব্যয়ের বাস্তব প্রভাব পড়েনি শিক্ষার্থীদের শেখার মানে। বাংলা, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা উল্টো কমেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এটি আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের সময়ে শিক্ষার মান অবনতির অন্যতম বড় উদাহরণ, যেখানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অবকাঠামোগত উন্নয়নে, অথচ শেখার গুণগত মানকে রাখা হয়েছে প্রান্তিক স্থানে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যসূচি এখনো মুখস্থনির্ভর, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সীমিত এবং শ্রেণীকক্ষে শেখার পরিবেশ দুর্বল। অনেক স্কুলে শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন শূন্য, ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে বড় ব্যবধান, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা শেখার প্রক্রিয়াকে নিষ্প্রাণ করে তুলেছে। ব্যানবেইসের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় এ সমস্যা আরো তীব্র, যেখানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও তদারকি প্রায় অনুপস্থিত। এ পরিস্থিতি শিক্ষার্থীর বাস্তব জ্ঞান অর্জন ও বিশ্লেষণক্ষমতা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম ও শহরের শিক্ষার মানে ব্যাপক ঘাটতি ও বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
মাধ্যমিক স্তরের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস স্কুলে পড়ে আন্তর্জাতিক মানে ছয় বছরের দক্ষতা অর্জন করে। ২০১৭ সালে এ ব্যবধান ছিল ৬ বছর ৫ মাস—অর্থাৎ গত কয়েক বছরে শিক্ষার মান আরো কমেছে। এ ইনডেক্সে বাংলাদেশের সর্বশেষ ২০২০ সালের তথ্য রয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মানে আরো অবনমন ঘটেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষার মানে দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে চলতি বছরের মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে। উভয় পরীক্ষাতেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মাধ্যমিকে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেশি নম্বর দিয়ে পাসের হার বাড়ানোর কোনো নির্দেশনা সরকার, মন্ত্রণালয় বা বোর্ড থেকে উত্তরপত্র মূল্যায়নকারীদের দেয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের এ দুরবস্থার পেছনে প্রধান কারণ শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মানহীন পাঠ্যপুস্তক, দুর্বল মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও অনিয়মতান্ত্রিক নীতি পরিবর্তন। স্কুলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও তা কেবল কাগজে-কলমে সীমিত। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই এবং শিক্ষকরাও এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘বাংলাদেশে শিক্ষা কখনই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে শিক্ষায় যা কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলো শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বিবেচেনা করে নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রকৃত অর্থে যে উদ্যোগগুলো দরকার যেমন—দক্ষ শিক্ষক, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সময়োপযোগী কারিকুলাম, যথাযথ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা তার কোনোটাই করা হয়নি। অথচ একটি রাষ্ট্র গঠনে সবার আগে প্রয়োজন শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্ব না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ড. মো. আব্দুস সালাম আরো বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে আমরা এ ধরনের সংস্কার আশা করেছিলাম, কিন্তু সেখানেও শিক্ষা উপেক্ষিতই থেকেছে। বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার কমিশন হলেও শিক্ষার জন্য কোনো কমিশন হয়নি। আবার ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ তৈরি করেছে মূলত বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশমালার ওপর আলোচনা করে। যেহেতু সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে শিক্ষার জন্য কোনো কমিশন ছিলই না, ফলে ঐকমত্য কমিশনে শিক্ষার সংস্কারে পর্যালোচনাভিত্তিক কোনো সুপারিশও আসেনি। আর ঐকমত্য কমিশন তো আলোচনা করেছে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার নানা বিষয় উঠে এলেও শিক্ষা গুরুত্ব পায়নি।’
শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকই নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও চিত্র তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না বললেই চলে। আওয়ামী আমলে শিক্ষকদের বড় অংশ একাডেমিক কাজের চেয়ে রাজনীতি, প্রশাসনিক পদ দখল ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বেশি যুক্ত হওয়ায় গবেষণার মানে ধস নেমেছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে—একসময় দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ তালিকায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিশ্ব র্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলোর মধ্যে শিক্ষা স্থান পেলেও মৌলিক অধিকারের তালিকায় স্থান পায়নি। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। তবে ৫৩ বছর পার হলেও এ বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ১১ ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যয়ে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরে নানা ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকার ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। এছাড়া তাদের মতে, শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করে মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে একধরনের শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়েছে। কারণ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে একজন নাগরিক আদালতে রিটের মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে পারেন, কিন্তু মূলনীতির ক্ষেত্রে তা বলবৎযোগ্য নয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই সনদে তারা এ সমস্যাগুলোর উত্তরণ প্রত্যাশা করেছিলেন।
শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন করা না হলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গত বছর অক্টোবরে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে চলতি বছর অক্টোবরে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুটি কমিটির নেতৃত্বেই আছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের সরকারগুলো শিক্ষাকে উপযুক্ত গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমান সময়েও উপযুক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। শুধু শিক্ষাই নয়, গণমানুষের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক যে সমস্যাগুলো, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পায়নি। আলোচনা হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। তারা গুরুত্ব দিয়েছেন তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আলোচনা হয়েছে ক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে, কিন্তু গণমানুষের মূল চাওয়াগুলো এখানে আসেনি। বাহাত্তরের সংবিধানেও শিক্ষা উপযুক্ত গুরুত্ব পায়নি, মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়েছিল। এখনো শিক্ষার অবস্থা সেই একই রকম। পরিস্থিতির উন্নয়নে আশাব্যঞ্জক কিছু নেই।’
সংস্কার প্রক্রিয়া ও জুলাই সনদে শিক্ষা খাত কেন গুরুত্ব পায়নি এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা চেয়েছিলাম নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বাস্তব পরিবর্তন আসুক। সবচেয়ে জরুরি ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসন—যেগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সেসব বিষয়ে সংস্কার। কিন্তু শিক্ষা কমিশন তো গঠিতই হয়নি; এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের শুরুটাই হয়েছিল কোটা সংস্কার ও কর্মসংস্থানের দাবিতে। আর কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র অবিচ্ছেদ্য। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকমত্য হতো যে এসব খাতে দলীয় প্রভাব চলবে না, তাহলে নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুণগত অগ্রগতি ঘটত। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সে জায়গায় কোনো কাজ হয়নি; এখন আমাদের পরবর্তী সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করতে হবে।’
জুলাই সনদে শিক্ষা খাতে সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলে আসছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটিকে নির্বাচনকেন্দ্রিকভাবে গড়ে তোলার প্রবণতা এতটাই প্রবল ছিল যে নীতিগত সংস্কারের এজেন্ডাগুলো বিশেষ করে শিক্ষা প্রাধান্য পায়নি। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতকে সমান গুরুত্ব না দিলে দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।’