স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় ভাষাশহীদ রফিকের বাড়ি, স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। তবে বছরের বাকি সময়জুড়ে নীরবে পড়ে থাকে এ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পাড়িল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্মরণে গ্রামের নামকরণ করা হয় রফিকনগর। ভাষা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০০ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। শহীদ রফিকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০০৮ সালের ২৪ মে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের উদ্যোগে রফিকনগরে নির্মাণ করা হয় স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। নির্মাণের পর বাংলা একাডেমি থেকে পাঠাগারের জন্য বেশকিছু বই সরবরাহ করা হয়। আশপাশের এলাকার মানুষ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শুরুতে জাদুঘর ও গ্রন্থাগার পরিদর্শনে এলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ কমতে থাকে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই খানিকটা লোকসমাগম বাড়ে রফিকনগরে। জাদুঘর ও গ্রন্থাগার ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়, শহীদ মিনারেও নতুন রঙ লাগে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে গেলে আবারো নীরবতা নেমে আসে। শহীদ রফিকের বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত শহীদ মিনারটিও বছরের অধিকাংশ সময় দর্শনার্থীশূন্য থাকে।
পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান ফরহাদ হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে পাঠকের উপস্থিতি ভালো ছিল। ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কমে আসে। বর্তমানে জাদুঘর দেখতে আর আগের মতো মানুষ আসেন না। লাইব্রেরিতে প্রায় ৩০ হাজার বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে, তবে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী সমসাময়িক বিষয়ের বই তুলনামূলক কম। আধুনিক ও সমসাময়িক বই সংযোজন করা গেলে পাঠক বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
প্রবীণ শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাশহীদদের ইতিহাস যথাযথভাবে পাঠ না করানোর কারণেই নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভাষা আন্দোলনের বীরদের ভুলতে বসেছে। পাঠ্যক্রম ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে আরো জীবন্ত করে তুলতে হবে।
খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান কলেজের শিক্ষক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে দেশপ্রেম ও মমত্ববোধ জাগ্রত করতে পারলে তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই পাঠাগার ও জাদুঘরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়বে।’
সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর উর্মিলা রায় বলেন, ‘নতুন প্রজন্মকে পাঠাগারমুখী করতে হলে পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। উদ্যোগী হয়ে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত রফিকনগর ঘুরে দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পাঠাগার ও জাদুঘরের আকর্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।’