প্রাচীন বাংলায় খেজুর গাছ ও গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল যশোর। খেজুরের রসের দীর্ঘকালীন ইতিহাসও রয়েছে। বিভিন্ন কারণে সে ঐতিহ্য হারাচ্ছে। গত তিন বছরে জেলায় খেজুর গুড় উৎপাদন কমেছে ১৬ শতাংশ। এ সময়ে খেজুর গাছ কমেছে প্রায় ৫০ হাজার এবং গাছি কমেছে দেড় হাজার। এ কারণেই গুড় উৎপাদন কমছে বলে মনে করেন চাষীরা। খেজুর গাছ রোপণ ও প্রশিক্ষিত গাছি তৈরি এবং গুড় উৎপাদন পদ্ধতি আধুনিকায়ন করলে হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে বলেও জানান তারা।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গুড় উৎপাদন বাড়াতে পতিত জমিতে খেজুর গাছ রোপণে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। সরকারিভাবে গাছিদের প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে জেলায় মোট খেজুর গাছ ছিল ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫টি। এর মধ্যে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৫টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ হতো। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহে গাছি ছিল ৬ হাজার ৮৫০ জন। প্রতিটি গাছ থেকে মৌসুমে গড়ে ১২৫ লিটার রস ও ১৩ কেজি গুড় উৎপাদন হয়। সে হিসাবে মোট গুড় উৎপাদন হয় ৪ হাজার ৩৯০ টন। ২০২০ সালে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫০টি। এর মধ্যে রস সংগ্রহ করা হয় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬০টি গাছ থেকে। এ সময়ে গাছি কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭২০ জনে। তবে প্রতিটি গাছ থেকে ১২৫ লিটার সংগ্রহ হলে গুড় উৎপাদন দাঁড়ায় ১২ কেজিতে। সে হিসাবে মোট গুড় উৎপাদন হয় ৪ হাজার ৯ টন। ২০২১ সালে খেজুর গাছ কমে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৫টি। এ সময়ে রস সংগ্রহের গাছের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৩৫টিতে। গাছির সংখ্যাও ৫ হাজার ৫৩০ জনে এসে দাঁড়ায়। আগের বছরের তুলনায় প্রতিটি গাছ থেকে গড় রস সংগ্রহ কমে দাঁড়ায় ১২০ লিটারে। মৌসুমে প্রতিটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন বেড়ে হয় ১৩ কেজি। সে হিসাবে মোট গুড় উৎপাদন দাঁড়ায় ৪ হাজার ১৬৫ টনে। এছাড়া ২০২২ সালে খেজুর গাছ আরো কমে হয় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৫৫টি। আর রস সংগ্রহের গাছের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৫টিতে। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য গাছি রয়েছে ৫ হাজার ১৫০ জন। মোট গুড় উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৭০৮ টন।
গত তিন বছরে জেলায় মোট গাছের সংখ্যা কমেছে ২১ হাজার ৩২৯টি। গাছি কমেছে ১ হাজার ৭০০ জন। এ সময়ে গুড় উৎপাদন কমেছে ৯৯৪ টন। জেলায় সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদন হয় বাঘারপাড়া উপজেলায়। সেখানকার চিত্রও আরো আশঙ্কাজনক। বাঘারপাড়া উপজেলায় পূর্ণ বয়স্ক খেজুর গাছ রয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার। এর মধ্যে রস উৎপাদনকারী গাছের সংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য গাছি রয়েছেন ১ হাজার ৪৫ জন। মৌসুমে রস উৎপাদন হয় ৫০ হাজার লিটার। এ থেকে গুড় উৎপাদন হয় ৪৯১ টন।
সার্বিক বিষয়ে যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত কৃষক খেজুর গাছের বাগান করতে চান না। কারণ গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার মধ্যে অনেক জটিলতা রয়েছে। আমরা এ জটিলতাকে আধুনিকায়ন করতে চেষ্টা করছি। গাছের মালিকরাও রস সংগ্রহ করেন না। অন্য মানুষ দিয়ে করায়। এজন্য উভয়ের লাভের পরিমাণও কম হয়। এ কারণে গাছির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগ পতিত জমিতে খেজুর গাছ রোপণের জন্য কৃষককে উদ্বুদ্ধ করছে। সরকারিভাবে গাছিদের প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে।’