অর্থ সংকটে থমকে আছে সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্প

আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে কক্সবাজারের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর সৈয়দপুর। ভৌগোলিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর যাত্রী পরিবহন ছাড়াও নেপাল, ভুটান ও ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত প্রদেশে ভ্রমণকারীদের অন্যতম পছন্দ বাংলাদেশী এ বিমানবন্দর। সৈয়দপুর পৌঁছে এরপর আশপাশের যেকোনো স্থলবন্দর

আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে কক্সবাজারের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর সৈয়দপুর। ভৌগোলিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর যাত্রী পরিবহন ছাড়াও নেপাল, ভুটান ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত প্রদেশে ভ্রমণকারীদের অন্যতম পছন্দ বাংলাদেশী বিমানবন্দর। সৈয়দপুর পৌঁছে এরপর আশপাশের যেকোনো স্থলবন্দর ব্যবহার করে প্রতি বছর প্রচুর পর্যটক প্রতিবেশী দেশগুলোয় ভ্রমণ করে। বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে পর্যটনের পাশপাশি ব্যবসা আন্তঃদেশীয় সংযোগ বৃদ্ধির জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে এটিকে ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক হাব বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু কভিড মহামারীর কারণে গতি হারায় কার্যক্রম। জমি অধিগ্রহণের কাজও ঠিকঠাক শুরু করা যায়নি। আর এখন ডলার সংকটের কারণে কাজ স্থগিত রেখেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংস্থাটি বলছে, বিমানবন্দরটির অনুকূলে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়। কারণে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কবে নাগাদ সৈয়দপুরের আত্মপ্রকাশ করতে পারবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

২০১৭ সালে সংসদে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে দেশের পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উন্নীত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ঘোষণা বাস্তবায়নে এবং আঞ্চলিক হাব গড়ার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ২১ মার্চ নীলফামারীর সৈয়দপুর দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার প্রায় ৯১২ একর জমির অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু করে বেবিচক। এর মধ্যে নীলফামারী জেলাতেই জমির পরিমাণ প্রায় ৫০০ একর। জমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল প্রায় সাড়ে হাজার কোটি টাকা। ওই বছরই কয়েক হাজার মালিককে নোটিস দেয়া হয়। তৈরি করা হয় বিমানবন্দরের নকশাও। কথা ছিল ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রমের পর চার বছর সময়সীমার মধ্যে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হবে। তবে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় আদতে আটকে আছে পুরো কার্যক্রমই।

বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দর সম্প্রসারণে সবার আগে রানওয়ে সম্প্রসারণ দরকার। যেটি করতে গেলে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা সৈয়দপুর দিনাজপুর জেলার সীমান্তবর্তী জমি অধিগ্রহণের জন্য নির্ধারণও করেছি। কিন্তু এতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন মুহূর্তে সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণে প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত রয়েছে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের বর্তমান রানওয়েকে কেন্দ্র করে অবকাঠামোগত প্রযুক্তিগত বেশকিছু উন্নয়ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নতুন করে অর্থছাড়ের নির্দেশনা পেলেই জমি অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশের সৈয়দপুরের সঙ্গে নেপালের ভদ্রপুর বিরাটনগরের মধ্যে আকাশপথে যাতায়াতের রুট চালুর বিষয়ে নেপালের প্রস্তাব ছিল। ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানিয়েছিলেন, নেপাল ভুটান চাইলে সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। এমনকি ভারতের ওই সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোও সুযোগ নিতে পারে। এরপর ২০২১ সালের মার্চে দেশটির প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারীর ঢাকা সফরে বিষয়টি নিয়ে আবারো আলোচনা হয়। সে সময় দুই দেশই একমতে পৌঁছে যে রুট চালু হলে তা পর্যটন আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বেবিচক কর্মকর্তারা বলছেন, মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নেপাল অনেকাংশেই ভারতীয় বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যেহেতু ভারতের নিজের বাণিজ্যই বিশাল পরিসরের, তাই পণ্য পরিবহনে নেপালকে বাড়তি সময় দিতে হয়। সেক্ষেত্রে সৈয়দপুর থেকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকারচিকেন নেকসদৃশ স্বল্প দূরত্বের সড়ক আকাশপথ উভয় রুটে পণ্য যাত্রী পরিবহন সুবিধা পেতে চায় নেপাল। গত বছর নেপালের পোখারায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বৈঠকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে সুতা রফতানির প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘নেপালের ভদ্রপুর বিরাটনগরের অবস্থান ভৌগোলিকভাবে আমাদের খুব কাছাকাছি। ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিয়ে নেপাল-ভুটান বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিদেশীয় ভ্রমণকারীদের একটি অংশ সড়কপথে যাতায়াত করছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের হলে ওই দেশের বিদেশযাত্রীরা আমাদের আকাশপথে ভ্রমণ করতে আরো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।

তিনি আরো বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকে উন্নীত হলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো গতি পাবে। স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৈয়দপুরের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর ব্যবহার করেছে লাখ ১৮ হাজার ২৩২ যাত্রী, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়। একই সময়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল লাখ ৯০ হাজার ৮৭৩।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (মিডিয়া) কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সৈয়দপুরের সুবিধা হলো উত্তরাঞ্চলীয় অনেকগুলো জেলার কেন্দ্রস্থল এটি। এছাড়া অর্থনৈতিক এলাকা, বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ভারতের সেভেন সিস্টার্সের মানুষও রুটটি পছন্দ করে।

তিনি বলেন, ‘ত্রিদেশীয় ভ্রমণকারীরা এখন ভেঙে ভেঙে সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করছে। এটি আন্তর্জাতিক রূপ পেলে ওই তিন দেশের বিদেশযাত্রীরাও ভৌগোলিকভাবে কম দূরত্বের কারণে সৈয়দপুরকে বেছে নেবে। এতে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব পাবে।

এভিয়েশন-সংশ্লিষ্টরা বলছে, সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত হলে সেখান থেকে নেপাল, ভুটান ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাতটি রাজ্যের নিকটতম বিমানবন্দরগুলোয় আকাশপথে যেতে সময় লাগবে ৩০-৫০ মিনিট, যা পর্যটকদের সময় বাঁচাবে, পরিশ্রম কমাবে।

১৩৬ দশমিক ৫৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ১৯৭৯ সালে কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার, আকাশপথে সময় লাগে ৪৮ মিনিট। বর্তমানে ঢাকা কক্সবাজার থেকে সৈয়দপুর রুটে প্রতিদিন ৩০টিরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বেসরকারি ইউএস-বাংলা নভোএয়ার।

আরও