বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সেমিকন্ডাক্টর, ব্লকচেইন, রোবোটিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ও অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বাজার। গড়ে উঠছে নতুন ধরনের কারখানা, প্রয়োজন হচ্ছে প্রযুক্তিগত জ্ঞানে দক্ষ মানবসম্পদ।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনই যে বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে, তার প্রতিফলন দেখা যায় দামি কোম্পানির তালিকাতে। বর্তমানে বিশ্বে বাজারমূল্যে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া, এরপর আইফোন নির্মাতা অ্যাপল, সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট, ই-কমার্স ও ক্লাউড সেবাদাতা অ্যামাজন এবং ইলোন মাস্কের স্পেসএক্স। তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা টিএসএমসি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির ব্রডকম, ইভির টেসলাও রয়েছে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে।
প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানি কোনো কোনো দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হয়ে ওঠার উদাহরণ দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ভূমিকা রেখেছে স্যামসাং। দেশটির শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তারা। সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্টফোন, মেমোরি চিপ ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী এ কোম্পানি দেশটির রফতানি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি গবেষণা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্বের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাইওয়ানের টিএসএমসি। কোম্পানিটি সে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। দেশটির জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ টিএসএমসির অবদান।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) হিসাবে, ২০২৩ সালে ১৭ ধরনের ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির সম্মিলিত বৈশ্বিক বাজার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩৩ সাল নাগাদ এ বাজার ১৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে শুধু এআইয়ের বাজারই ১৮৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, বৈশ্বিক আইসিটি সেবা রফতানিই ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের। আর ডিজিটাল মাধ্যমে সরবরাহযোগ্য বিভিন্ন সেবার রফতানি পৌঁছেছে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়নে।
বিশাল এ বাজারের বড় অংশ দখলে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ২০২০-২৪ সময়কালে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোয় ডিজিটাল খাতের নতুন প্রকল্পে ৫৩১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই গেছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, চীন ও ব্রাজিলসহ ১০টি দেশে। এ দ্রুত সম্প্রসারণশীল প্রযুক্তি অর্থনীতিতে বাংলাদেশ প্রায় অনুপস্থিত। দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইসিটি সেবা রফতানি ছিল মাত্র ৭২৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশ এখনো দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো বাজার, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, বিনিয়োগ ক্ষেত্র কিংবা উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি রফতানিকারক—কোনোটিই হয়ে উঠতে পারেনি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনাতেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। একই সময়ে ভারতের আইটি রফতানি ছিল প্রায় ২২৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানের প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের প্রযুক্তি সেবা রফতানি পাঁচ গুণেরও বেশি এবং ভারতের রফতানি তিনশ গুণের বেশি। এ ব্যবধান বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসায় বাংলাদেশের যৎসামান্য অংশগ্রহণের চিত্রই তুলে ধরে।
উদ্ভাবনেও বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এ ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে সবার নিচে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণার সমন্বয় না থাকা উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এখনো ফলাফল ও সনদনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ রয়েছি। ফলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, উদ্ভাবনী দক্ষতা প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে উঠছে না। এছাড়া শিল্প খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকাও উদ্ভাবনের পথে বাধা।’
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স মূলত সাতটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এ সাত সূচকের প্রায় সবক’টিতেই বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেন, ‘গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এ বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ বিনিয়োগের ঘাটতি। এছাড়া ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগের অভাব, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতাও বড় বাধা। নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, নীতির অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১১৭টি বেসরকারি ও ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্বজুড়ে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়ালেও বাংলাদেশের চিত্র অনেকটাই বিপরীত। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট বাজেটের দেড় শতাংশেরও কম বরাদ্দ থাকে গবেষণায়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসির অনুমোদিত বাজেট ছিল প্রায় ১৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
গবেষণায় বরাদ্দ কম হওয়ার পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা ব্যয় করতে না পারার সমস্যাও রয়েছে। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি বছরই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য পাওয়া অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারে না। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা ব্যয় অর্ধকোটি টাকারও কম।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন হলেও সেগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। উদ্ভাবনের পর পেটেন্ট, ইনকিউবেশন ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য বাজারে নেয়ার জন্য কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় লিগ্যাল কাঠামোর ঘাটতি দূর করা না গেলে উদ্ভাবনের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।’
অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর এ যুগেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের বড় অংশই কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যয়নরত। শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশ এ দুই অনুষদের অন্তর্ভুক্ত। বিপরীতে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, কৃষি এবং চিকিৎসাবিষয়ক অনুষদগুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সম্মিলিত হার মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এক দশকেও দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
চলতি বছর প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৭’-এ বিশ্বের শীর্ষ ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান জায়গা পায়নি। এতে বাংলাদেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১-১০০০-এর মধ্যে। শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অবস্থান এক হাজারের পরে। এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট সাতটি প্রতিষ্ঠান জায়গা পেয়েছে ১০০১-১২০০ র্যাংকের মধ্যে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) ২০২৭ সালের র্যাংকিংয়েও বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান দুর্বল।
গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির এ সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের প্রযুক্তি ব্যবসা ও রফতানিতে। গত কয়েক বছর ধরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রফতানিতে কিছু অগ্রগতি হলেও বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের সঙ্গে ব্যবধান এখনো বড়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিপণ্য তৈরির ক্ষেত্রে সে ধরনের বিনিয়োগ হয়নি। ফলে কিছু প্রযুক্তির ব্যবহার ও অভিযোজন সম্ভব হলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমাদের অংশগ্রহণ সীমিত। এছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মৌলিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা একেবারে কম। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগও নেই। ফলে নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন না আনলে প্রযুক্তি ব্যবসা ও উদ্ভাবনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা কঠিন হবে।’
ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে করপোরেট খাতের গবেষণা বিনিয়োগ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মতে, এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। পাশাপাশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের বড় অংশ যাচ্ছে লাইফ সায়েন্সেস, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস, জ্বালানি ও অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালসের মতো উচ্চ প্রযুক্তির খাতে।
প্রযুক্তিনির্ভর এ বিনিয়োগ এখন শুধু উন্নত অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের মতো মধ্যম আয়ের দেশে উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদন, আইসিটি সেবা ও সবুজ প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দেয়া, বিজ্ঞানভিত্তিক স্টার্টআপে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব সুরক্ষায় পেটেন্ট ও অন্যান্য মেধাস্বত্ব অধিকারের গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসায় প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে নয়; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণায় বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব অর্জন এবং উদ্ভাবনকে বাজারে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।
বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো উদ্ভাবন, গবেষণা বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও মৌলিক গবেষণা, নিজস্ব প্রযুক্তিপণ্য তৈরি, উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্ত অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত।
বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ফাহিম মাশরুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে বাংলাদেশ বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও অর্জন খুবই সীমিত। দেশের আইসিটি খাতের বাজেট যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে, নীতিনির্ধারণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রযুক্তি শিল্প প্রত্যাশিত গবেষণাভিত্তিক সহায়তা পাচ্ছে না। গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি এবং আইসিটি খাতে বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
এআই ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চ মূল্যের প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রাথমিক পর্যায়ে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি হয়েছে এবং দেশে ৭০০-এর বেশি চিপ ডিজাইনার কাজ করছেন। খাতসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এ রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও জাতীয় নীতি, বাংলা ভাষাভিত্তিক সক্ষমতা এবং নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টরে কার্যক্রম মূলত চিপ ডিজাইন সেবাকেন্দ্রিক, আর এআইয়ে গবেষণা, উচ্চ ক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামো, নিজস্ব মডেল ও বাণিজ্যিক প্রয়োগের সক্ষমতা এখনো সীমিত। ফলে এ দুই উদীয়মান প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো উল্লেখ করার মতো নয়।
বৈশ্বিক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা, এআইয়ের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি, তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। এজন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য আমাদের কয়েকটি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। এর মধ্যে আইনি অবকাঠামো, কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, এআই এবং প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে এআইয়ের অবকাঠামো ও নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে। বাংলা ভাষায় নিজস্ব বৃহৎ ভাষা মডেল (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল—এলএলএম) তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এসব ভিত্তি শক্তিশালী হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’