রংপুরে বেড়েছে মরিচ আবাদের জমি ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা

রংপুরে চলতি রবি মৌসুমে ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে কাঁচামরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা গত (২০২২-২৩) রবি মৌসুমের চেয়ে ৬৫ হেক্টর বেশি।

রংপুরে চলতি রবি মৌসুমে ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে কাঁচামরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা গত (২০২২-২৩) রবি মৌসুমের চেয়ে ৬৫ হেক্টর বেশি। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২২ হাজার ৫০ টন যা গত মৌসুমের চেয়ে ১ হাজার ২০০ টন বেশি। যদিও আগাম মরিচ চাষীরা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। তবু গত বছরের মতো চলতি বছরও মরিচের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকা এবং চরাঞ্চলের কৃষক মরিচ চাষে আগ্রহী হওয়ায় এবার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৩-২৪) রবি মৌসুমে ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে কাঁচামরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৮৫০ টন। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় আবাদ হয়েছে ২৭০ হেক্টর। এর মধ্যে ৯০ হেক্টর আবাদ হয়েছে পীরগঞ্জ উপজেলায় এবং মিঠাপুকুর উপজেলায় আবাদ হয়েছে ৪৫ হেক্টর, বাকি ১৩৫ হেক্টর মরিচ আবাদ হয়েছে তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, বদরগঞ্জ, পীরগাছা, সদর ও মেট্রো এলাকায়। গত বছর ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় মরিচের আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ২০ হাজার ৮৫০ টন।

মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের দৌলতপুর নূরপুর গ্রামের কৃষক সহিদুজ্জামান শাহী বলেন, ‘‌১৫ দিন আগে দুই বিঘা জমিতে স্থানীয় আউশা জাতের মরিচের ১০ কেজি বীজ ছিটিয়ে ছিলেন। এর আগে জমি তৈরির জন্য দুই বস্তা করে টিএসপি এবং এমওপি সার দিয়েছেন। কিন্তু বপনের তিনদিনের মধ্যে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে আমার বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমার ২৫ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এখন আবার চারদিন আগে ওই জমিতে নতুন করে বীজ ছিটিয়েছি। প্রতি কেজি বীজ ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে কিনেছি। গত বছর ওই পরিমাণ জমিতে মরিচ চাষ করে ৭০ দিন থেকে ফলন পাই। প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল মরিচ আহরণ। প্রতি আড়াই শতকে মরিচ পেয়েছি চার-পাঁচ মণ। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। গত বছর প্রায় ৪ লাখ টাকার মরিচ বিক্রি করেছি।’ 

জেলার কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলার চরগুলোয়ও দিন দিন মরিচের আবাদ বাড়ছে। কাউনিয়া উপজেলার চর গদাই এলাকার কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘১৫ দিন আগের বৃষ্টিতে আমার ১০ হাজার আগাম মরিচ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে ৬২ শতক জমি পরিচর্যা শেষে ভালো হাইব্রিড জাতের মরিচ গাছের জন্য নার্সারিতে বলে রেখেছি। গত বছর আমি হাইব্রিড জাতের ১২ হাজার মরিচ গাছ রোপণ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। হাইব্রিড জাতের মরিচ গাছে ৬০-৬৫ দিনের পর থেকে ফলন পাওয়া যায়। প্রথম দিকে একেকটি গাছে দুই-তিনটি মরিচ ধরে। পরে মরিচের সংখ্যা বেড়ে যায়। রোগবালাই না হলে  প্রতিটি গাছে গড়ে ১৫০টি পর্যন্ত মরিচ ধরে।’

দীর্ঘদিনের মরিচ চাষের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘গত বছর মরিচের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। কৃষক মরিচের দাম মণপ্রতি ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছিলেন। যদি মরিচের মণ ১ হাজার টাকাও থাকে তবু কৃষকের লোকসান হবে না।’ 

গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘন্টা ইউনিয়নের চর ছালাপাকসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে কৃষক ব্যাপক হারে মরিচ চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। অল্প পরিমাণ জমিতে তারা মরিচের আবাদ করছেন। 

চর ছালাপাক গ্রামের কৃষক সুরুজ মিয়া বলেন, ‘‌হাইব্রিড জাতের ১০০ গাছ ২৫ দিন আগে ৬ শতক জমিতে রোপণ করেছি। ৬০ দিন পর থেকে ফলন পাওয়া যাবে। একটি গাছ থেকে ৫ কেজি মরিচ পাব বলে আশা করছি। গত বছর ওই পরিমাণ জমি থেকে প্রাপ্ত কাঁচামরিচ রোদে শুকিয়ে ২০ কেজি পেয়েছিলাম। শুকনো মরিচ প্রতি কেজি বিক্রি করেছি ৩৫০ টাকা দরে। মরিচ উৎপাদনে খরচ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা।’ 

জেলার একাধিক মরিচচাষী জানান, গত বছর বিভিন্ন হাটে পাইকারি  দরে মরিচ বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। এ সময় মরিচের অস্বাভাবিক মূল্য রোধে সরকার পাশের দেশ থেকে মরিচ আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চলতি বছরও মরিচের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘‌দাম ভালো পাওয়ায় এমনিতে কৃষক মরিচ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। চরেও মরিচের আবাদ বাড়ছে। এছাড়া এখন মরিচের উন্নত জাত ও বীজের কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবে মাত্র শুরু করেছি। প্রতি গ্রামে ১০-১২টি পরিবারকে নির্বাচিত করে তাদের বস্তায় মরিচ আবাদের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যাতে বর্ষায় গাছের কোনো সমস্যা না হয়।’

আরও