নানা সংকটে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিষেবা সীমিত হওয়ায় বেসরকারি ক্লিনিকমুখী হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এ সুযোগে জেলায় বেড়েই চলেছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় ২৪০টি ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল রয়েছে, যার মধ্যে ৬৬ শতাংশেরই অনুমোদন নেই। বেশির ভাগ হাসপাতালে নেই অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্স। অধিকাংশ ক্লিনিকে নেই আবাসিক চিকিৎসক। কোনো কোনো ক্লিনিকে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীও চিকিৎসা দিচ্ছেন রোগীদের। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
স্থানীয়রা বলছেন, নিয়মের তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নেই আবাসিক চিকিৎসক, অভিজ্ঞ নার্স। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গড়ে ওঠেনি। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও ব্যস্ত থাকেন ক্লিনিক নিয়ে। রোগীরা সরকারি হাসপাতালে গেলে পাঠানো হয় নিজস্ব ক্লিনিকে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় বর্তমানে ২৪০টি বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৮১টির লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৬৬ শতাংশ অর্থাৎ ১৫৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনুমোদনই নেই।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, বাউফলে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল রয়েছে ৩৮টি। কলাপাড়ায় ৩৪, গলাচিপায় ৩০, দশমিনায় ১০, মির্জাগঞ্জে ১৩, দুমকিতে ১৩, পটুয়াখালী সদরে আটটি, পৌর এলাকায় ৯০ এবং রাঙ্গাবালীতে রয়েছে চারটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে বাস্তবে এ সংখ্যাও আরো বেশি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানই নাম পরিবর্তন করে বা নতুন বোর্ড ঝুলিয়ে পুরনো কাঠামোর মধ্যেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, যেগুলো সরকারি কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত কিংবা নজরদারিতে নেই।
তালিকাভুক্ত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকগুলোর অধিকাংশের অবস্থান জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর আশপাশে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পাশেই অবস্থিত রয়েল ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তার পাশেই রয়েছে পটুয়াখালী হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। রয়েল ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান দুটি ভবনে একই নামে পরিচালিত হচ্ছে। কাগজ কলমে দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও বাস্তবে এটি একই মালিকানায় পরিচালিত। হাসপাতালটির ম্যানেজার দাবি করেন, তারা লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়ায় আছেন এবং সিভিল সার্জন কার্যালয় তাদের সম্পর্কে অবগত।
পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে পটুয়াখালী ইসলামী চক্ষু হাসপাতাল। অনুমোদনই না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তিন বছর ধরে চোখের সার্জারি করে আসছে। প্রতি মাসে ৩০-৫০ জন রোগীর অপারেশন করা হয় বলে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া পৌর শহরের বাঁধঘাট এলাকায় রয়েছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এমবিবিএস চিকিৎসক না থাকায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী একজন নারী রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি একাই রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষারসহ প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। ওই প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কোনো ল্যাব টেকনিশিয়ান ও টেকনোলজিস্টও পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. সুমন বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। ছোট প্রতিষ্ঠান তাই সবসময় স্টাফদের দরকার হয় না। আমার এক আত্মীয় এমবিবিএস পাস করেছেন। তাকে শিগগিরই এখানে বসানো হবে।’
শহরের ছোট চৌরাস্তায় একটি ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে নিউরন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ক্লিনিকটিতে বেশ কয়েকজন রোগী ভর্তি থাকলেও কোনো আবাসিক চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। তবে একজন নার্স ও রিসিপশনিস্টসহ একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান রয়েছেন। তারা বলেন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার সকালে ও বিকালে দুইবার রোগী এসে দেখে চলে যান। পুরোপুরি নির্দেশ মেনে কোনো ক্লিনিক চালানো সম্ভব নয়।
গলাচিপা উপজেলার পূর্ব বাজার মেডিসিন মার্কেটে মডার্ন কম্পিউটারাইজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সরজমিনে দেখা গেছে, একজন রোগীকে রক্ত দিয়ে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। একজন নারী চিকিৎসক সেখানে রোগী দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিচ্ছেন। কিছু রোগীকে হাসপাতাল রোডে অবস্থিত দ্য নিউ লাইফ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠানো হচ্ছে। দুটি ছোট রুমে গাদাগাদি করে রোগী ভর্তি রয়েছে অন্তত ১৫ জন। সেখানে আরো ১৫টির মতো বেড রয়েছে। কিন্তু সরকারি অনুমোদন আছে ১০টি বেডের।
ওই ক্লিনিকে ভর্তি রয়েছেন রেণু আক্তারের মেয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি রাঙ্গাবালী থেকে এসেছি। মেয়ের অস্ত্রোপচারের জন্য ১৪ হাজার টাকা, এছাড়া ওষুধ ও অন্যান্যসহ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে।’
হাসপাতালটির ম্যানেজার শ্রী মলয় বাবু বলেন, ‘আমি শুধু ম্যানেজার, অনুমোদন-সংক্রান্ত কোনো বিষয় আমার জানা নেই। কাগজ দেখে বলতে পারব।’
গলাচিপা উপজেলার সামুদাবাদ উদয়ন স্কুলের পাশে অবস্থিত নাইমা কবির ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ক্লিনিক, যার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সরজমিনে দেখা গেছে, নিলুফা বেগম নামে এক নারীর জরায়ুর মুখে টিউমার অপারেশন করা হয়েছে ১৫ দিন আগে। অপারেশন-পরবর্তী চারদিন ভর্তি থেকে বাড়ি চলে যান তিনি। কিন্তু ১১ দিন পর ইনফেকশন হওয়ায় পুনরায় একই ডাক্তারকে দেখানোর জন্য ভর্তি হয়েছেন। তবে এবার আর ডাক্তারের দেখা মেলেনি। এ ব্যাপারে ক্লিনিকের মালিক ডা. নাইমা কবিরের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল-সংক্রান্ত সব ব্যাপার সিভিল সার্জন নিজে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর পরও উপজেলায় যদি কোনো অনিয়ম ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত দুই অর্থবছরে জেলায় মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস ও ১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একটি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়নি। বরং যেগুলোর লাইসেন্স বাতিল হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও নতুন নামে আবার চালু হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. খালিদুর রহমান মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত তালিকা করছি। চারটা উপজেলার তালিকা হয়ে গেছে। বাকিগুলোও হয়ে যাবে। বর্তমানে ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলছে। এজন্য কাজটি দেরি হচ্ছে। আমার সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কথা হয়েছে, বাকি উপজেলাগুলোর তালিকা শেষ করেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।’