সিপিডির মিডিয়া ব্রিফিং

জীবাশ্ম জ্বালানিতে কর সুবিধা দিয়ে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমপরিমাণ কর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর আরোপ করা হলে সরকার বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারত।

অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানিকে কর সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর মোট করের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ খাতের সরঞ্জামের ওপর মোট করের হার প্রায় ৩১ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গতকাল এ তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য: জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে কর কাঠামোতে ইউরোপের মতো সবুজ রাজস্ব নীতি গ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়াও কয়লা আমদানির ওপর সৌরবিদ্যুতের সমপরিমাণ কর আরোপ করা হলে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতো প্রায় ৬৬৪ কোটি টাকা। তবে জ্বালানি তেলে সৌরবিদ্যুতের কর কাঠামো প্রয়োগ করলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্টো প্রায় ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা কমে যেতে পারে।

সিপিডি মনে করে, দেশের টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম প্রধান বাধা হলো জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক-কর বৈষম্য। একদিকে এলএনজি আমদানিতে শূন্য ভ্যাট এবং অগ্রিম আয়কর মাত্র ২ শতাংশ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সোলার প্যানেলসহ গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপ করা হয়েছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ কৃত্রিমভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এ বৈষম্য দূর করতে এবং রাজস্ব ক্ষতি কমাতে সিপিডি বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এলএনজি আমদানির ওপর বিদ্যমান শূন্য ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার করে সাধারণ জ্বালানির মতো ১৫ শতাংশ ভ্যাট পুনর্বহাল করা, সোলার ও উইন্ড সরঞ্জামের ওপর থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর বাতিল করা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট গ্রিড ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য বিশেষ ‘সবুজ ভর্তুকি’ ও অনুদান বরাদ্দ রাখা।

বিশ্বে সবুজ রাজস্ব নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও বাংলাদেশের কর কাঠামোয় এ চিত্র উল্টো বলে মন্তব্য করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতির জন্য সবুজ রাজস্ব নীতি গ্রহণ করছে। এর মূল লক্ষ্য জীবাশ্ম জ্বালানির শুল্ক ও কর কাঠামোর ওপর থাকা সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নেয়া। একই সঙ্গে সবুজ কর ও সবুজ বাজেট কাঠামো নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সবুজ রাজস্ব নীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিয়েছে।’

সিপিডির গবেষণা পরিচালক আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো আধুনিক বাজেট কাঠামো থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। যদিও দেশের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত আমদানির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো ধীরে ধীরে সবুজ রাজস্ব কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া।’ তবে বর্তমান কর কাঠামোয় এর উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ঐতিহাসিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ খাতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পক্ষের কায়েমি স্বার্থ রয়েছে। তাদের শক্তিশালী লবিং ও চাপের কারণে দেশের জ্বালানিভিত্তিক রাজস্ব কাঠামোটি ক্রমান্বয়ে একপেশে হয়ে পড়েছে। এজন্য আগামী বাজেটে সবুজ রাজস্ব নীতি ঘোষণা করা প্রয়োজন।’

জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় সৌরবিদ্যুতে যন্ত্রপাতির ওপর এখনো কর বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার সৌরবিদ্যুতের কিছু উপাদানের ওপর শুল্ক কমিয়েছে। এটি ইতিবাচক হলেও এর সহায়ক অবকাঠামোর ওপর এখনো উচ্চ শুল্ক বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ও গ্রিড লাইনের যন্ত্রপাতির ওপর চড়া কর চাপানো রয়েছে। এর বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুবিধা পাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে রাখা হয়েছে নিম্ন শুল্ক।’

আরও