বিশেষ করে ফিশারিজ, খাদ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরশক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে দেশটির আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে সমন্বিত অংশীদারত্বে (কম্প্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ) উন্নীত করতে চায় বাংলাদেশ।
গতকাল রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সৌদি আরবের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী প্রকৌশলী ওয়ালিদ আল-খেরেইজির সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মূলত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো উন্নত করার লক্ষ্যেই সৌদি প্রতিনিধি দলের এ সফর। তিনি জানান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের প্রতি সৌদি সরকারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে। বৈঠক অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে সৌদি আরবের আগ্রহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব শুধু একটি খাতে নয়, বহু খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়। ফিশারিজ, খাদ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরশক্তি, আইটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশী কর্মীদের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় সেখানে নিহত তিন বাংলাদেশীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে সৌদি পক্ষ। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সৌদি সরকারের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরো বেশি দক্ষ বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।
তিনি আরো বলেন, ‘সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশও সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।’ সামনে বিনিয়োগবিষয়ক একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ওই বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেবেন।’ এছাড়া চলতি বছর বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে রাজনৈতিক পরামর্শ সভা এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফর প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগ্রহ রয়েছে। দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে সুবিধাজনক সময়ে সে সফর অনুষ্ঠিত হবে।’
কনস্যুলার ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয় প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের সমস্যা শুধু সৌদি আরবেই নয়, প্রায় সব দেশেই রয়েছে। তবে এগুলো এ সফরের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল না। রিয়াদে বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়গুলো সমাধানে কাজ করছে।’
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্ট পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল কাজ করছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টেকনিক্যাল টিম বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। এটি একটি চলমান ও নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সৌদি আরবের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং সংলাপ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচলের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে (এমএমডিসি) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, সৌদি উপমন্ত্রী বাংলাদেশের বন্দর, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে দেশটির আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ঢাকায় তৃতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের পরামর্শ সভা এবং বাংলাদেশ-সৌদি আরব যৌথ কমিশনের ১৫তম বৈঠক দ্রুত আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি সৌদি আরবের অব্যাহত মানবিক ও রাজনৈতিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে সৌদি আরবের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এছাড়া নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়। বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরো জোরদার এবং পারস্পরিক স্বার্থে কৌশলগত অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।