চট্টগ্রামের বিশেষায়িত হাসপাতাল বিআইটিআইডি

এক যুগেও চালু হয়নি পূর্ণাঙ্গ সেবা ল্যাব থাকলেও পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকায়

স্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, এ অত্যাধুনিক গবেষণাগারে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা নির্ণয়ের জিন এক্সপার্ট, রিয়েল-টাইম পিসিআর, একাধিক জীবাণু শনাক্তের বায়োফায়ার, ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ভিটেক-২, ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা নির্ণয়ের এলপিএ ও রক্তে জীবাণু শনাক্তের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি রয়েছে।

রোগ নির্ণয়ের অত্যাধুনিক ল্যাব আছে, বিশেষায়িত বিভাগ আছে, রোগীও বাড়ছে। নেই শুধু পূর্ণাঙ্গ সেবা দেয়ার সক্ষমতা। এক যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)। জাতীয় পর্যায়ের এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ১৪ বিভাগের ১০টিই চালু করা যায়নি। জনবল সংকটে চালু হয়নি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সেবা, থমকে আছে গবেষণার বড় অংশ। এমনকি চট্টগ্রামে সংক্রামক রোগের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পাঠাতে হয় ঢাকায়।

বিআইটিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সংক্রামক ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে বিআইটিআইডি। এক যুগ পরও প্রতিষ্ঠানটি সে লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। নকশায় ১০ তলা ভবন করার কথা থাকলেও নির্মাণ থেমে আছে চারতলায়। পরিকল্পিত বিভাগগুলোর অনেকগুলোতে চিকিৎসক ও গবেষক নেই। আবার তৈরি করা পদগুলোর কাঠামোগত জটিলতার কারণে বিশেষজ্ঞ নিয়োগও সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে বেড়েছে রোগীর চাপ। জানা গেছে, ২০২৫ সালে এখানে চিকিৎসা নিয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৩ জন। কভিডের সময় এ প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে চার বছরে ৩ লাখ ১১ হাজার ২২৮টি আরটিপিসিআর পরীক্ষা হয়েছে। ফলে সক্ষমতার ঘাটতির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে পরিকল্পনা, জনবল ও ব্যবস্থাপনার সংকট।

বিআইটিআইডির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে অন্যতম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এমএ ফয়েজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামে অবস্থিত হলেও এটি কোনো আঞ্চলিক হাসপাতাল নয়। এটি দেশের একমাত্র জাতীয় পর্যায়ের স্নাতকোত্তর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান; যেখানে সংক্রামক ও ট্রপিক্যাল রোগের চিকিৎসা, মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার কথা। সেজন্য গবেষণা খাতের বিষয় পরিকল্পনা করে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, কভিড-১৯, ডেঙ্গু, নিপাহসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি ছিল। কিন্তু জাতীয় এ সম্পদকে ফেলে রাখা হয়েছে। হাসপাতালটি দেশের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও রোগতত্ত্ব গবেষণায় মাইলফলক হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে চলছে।’

ফৌজদারহাটে ২০০৭ সালে বিআইটিআইডির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে বিআইটিআইডিতে স্বাস্থ্যসেবা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। জানা গেছে, নকশা অনুযায়ী ভবনটি বেজমেন্টসহ ১০ তলা করার পরিকল্পনা ছিল। তবে বেজমেন্টসহ চারতলা নির্মাণের পর মূল নির্মাণকাজ আর এগোয়নি।

হাসপাতালের চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিআইটিআইডিতে ১০টি বিভাগের কোনো চিকিৎসাসেবা নেই। এ বিভাগগুলোতে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রোগব্যাধির যে গবেষণা হওয়ার কথা ছিল, সেটিও সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পে বিআইটিআইডি ভবনটি ১০ তলা সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে প্রকল্পটি সরিয়ে নিতে জায়গা খোঁজা হচ্ছে। ফলে বিআইটিআইডির ভবনটি সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না।

বিআইটিআইডির চিকিৎসকরা বলছেন, ভাইরোলজি বিভাগ আছে, কিন্তু চালু নেই। এ বিভাগ থাকলে বিভিন্ন রোগের ভাইরাস নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা দেয়া যেত। মেডিকেল এন্টোমোলজি বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের ভেক্টর বা বাহকগুলো নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হতো। নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস বিভাগে বিভিন্ন ধরনের ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, অ্যাজমা, সিবিডি এমন কমন কিছু রোগ নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা করা সম্ভব হতো। এছাড়া ট্রপিক্যাল হাইজিন বিভাগে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও সংক্রামক রোগের পরিবেশগত কারণ, পানি, স্যানিটেশন, খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে গবেষণা ও রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। এসব বিষয় আসলে চালু করার প্রয়োজন, কিন্তু গবেষণার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া না যাওয়ায় বিভাগগুলো আলোর মুখ দেখেনি।

জানা গেছে, এসব বিভাগে পদ সৃজন নিয়েও নানা সমস্যা আছে। উদাহরণস্বরূপ ট্রপিক্যাল চাইল্ড হেলথ বিভাগ। এ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদ একটি, সহকারী অধ্যাপক পদ একটি, রেজিস্ট্রার দুজন ও গবেষণা কর্মকর্তা একজনসহ মোট পাঁচটি পদ রাখা হয়েছে। এখানে কোনো বিশেষজ্ঞ পাওয়া গেলেও অধ্যাপক পদ না থাকায় তাদের পদায়ন করা সম্ভব হয় না। আবার জুনিয়র পদে কেউ যোগ দিলেও অধ্যাপক পদ না থাকায় পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয় না।

হাসপাতালের পদক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জাতীয় এ স্বাস্থ্যসেবা ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদ থাকলেও সেটি শূন্য আছে। উপপরিচালককে ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে অধ্যাপক আছেন একজন, সহযোগী অধ্যাপক তিনজন, সহকারী অধ্যাপক ১২ জন, জুনিয়র কনসালট্যান্ট একজন, রেজিস্ট্রার ছয়জন, মেডিকেল অফিসার ১৯ জন, অ্যানেস্থেটিস্ট পদে তিনজনসহ মোট ৪৬ জন কর্মরত। এছাড়া নার্স, সহকারী নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, অ্যাকাউন্টস অফিসারসহ অন্যান্য পদে মোট স্থায়ী ১০৪ জন এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৪৪ জনসহ মোট ১৫১ জন কর্মরত।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের শয্যা বসানো হয়েছে ভবনটির গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায়। জানা গেছে, ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা এবং পৃথক রোগীদের আলাদা শয্যা ব্যবস্থাপনা থাকার কথা থাকলেও মাত্র চারতলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ছয়তলা ভবনের কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বাজেট ও পরিকল্পনার অভাবে। অন্যদিকে বিআইটিআইডির জায়গায় অস্থায়ীভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানোয় জায়গা আরো সংকুচিত হয়ে এসেছে। মেডিকেল শয্যা সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালটিতে পানির সংকট বেশি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ ব্যবস্থাপনায় গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও সেখানকার পানি অতিমাত্রায় লবণাক্ত।

বিআইটিআইডিতে অত্যাধুনিক বায়োসেফটি গবেষণাগার আছে। দেশে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বিতে এ ল্যাব আছে। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরীক্ষা এ ল্যাবে করা সম্ভব হলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন, কিট ও জনবল না থাকায় পরীক্ষাটি নিয়মিত চালু রাখা যায়নি। ফ্রান্সের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এ গবেষণাগারে আধুনিক রোগ নির্ণয় ও গবেষণার বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। এখনো ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠানটি এ গবেষণাগারের তত্ত্বাবধান করে।

স্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, এ অত্যাধুনিক গবেষণাগারে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা নির্ণয়ের জিন এক্সপার্ট, রিয়েল-টাইম পিসিআর, একাধিক জীবাণু শনাক্তের বায়োফায়ার, ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ভিটেক-২, ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা নির্ণয়ের এলপিএ ও রক্তে জীবাণু শনাক্তের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি রয়েছে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, ডেঙ্গু, বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, হেপাটাইটিস ও কভিড-১৯সহ বিভিন্ন রোগের পরীক্ষাও করা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামে চলমান হাম-রুবেলায় আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার জন্য চলতি বছরে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮৯২টি নমুনা কেন্দ্রীয় ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়েছে। কিট সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় লোকবল থাকলে এ পরীক্ষা চট্টগ্রামেই সম্ভব ছিল।

বিআইটিআইডির পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ইফতেখার আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালটিতে ১৪টি আধুনিক বিভাগ স্থাপন হলেও বেশির ভাগই চালু হয়নি। বেশকিছু বিভাগ আছে যেগুলো বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ানো হয়, কিন্তু কোনো স্বতন্ত্র বিভাগ নেই। যেহেতু সে বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে নেই, তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও পাওয়া যায় না। ফলে হাসপাতালের যে অর্গানোগ্রাম আছে তাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। ফলে বিভাগও চালু হয়নি। হাসপাতালটির ভবন নির্মাণও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। লোকবল নেই, পানির সমস্যা, রোগীদের শয্যা বসাতে হয়েছে ভবনের গাড়ি পার্কিংয়ে।’

তিনি আরো জানান, গবেষণার লোকবল ও চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি হাসপাতালটি নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন কাঠামোতে সাজাতে হবে। বিভাগগুলোর নাম সংস্কার না করলে এ হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম কখনই চালু করা সম্ভব হবে না। বিভাগগুলো চালু করতে হবে। অন্যথায় হাসপাতালটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে স্থাপন করা হয়েছিল তা বাস্তবায়ন সম্ভব না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বড় জনগোষ্ঠীর জন্য চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র। চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার রোগীরা চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের ওপর নির্ভর করে। এসব অঞ্চলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, সর্পদংশন, জলাতঙ্ক, নিপাহসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বিআইটিআইডিতে সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও গবেষণার সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে উঠলে শুধু চট্টগ্রাম নয়; বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রোগ নজরদারি ও দ্রুত রোগ নির্ণয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইটিআইডি চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজি অফিস) হাসপাতালটি তদারক করে। জাতীয় এ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। ল্যাবটি হামের উপসর্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকা থেকে অনুমোদন পাইনি। হাসপাতাল নিয়ে প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি উদ্যোগ নেন তাহলে পরিবর্তন আসবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি চালু করা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অধিদপ্তরকে জানিয়েছি।’

আরও