দেশের নদ-নদীর অবস্থা যাচাই, পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কৌশল এবং দূষণমুক্ত করার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প নেয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। এর আওতায় ৪৮ নদ-নদীর সমীক্ষা করা হয়, যেখানে উঠে আসে দূষণকারী ও দখলদারদের তালিকাসহ বিস্তারিত তথ্য। তবে বছর ঘুরলেও প্রকাশ করা হয়নি সেই সমীক্ষা প্রতিবেদন। এনআরসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আরো যাচাই-বাছাই শেষে তা প্রকাশ করা হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ, মূলত দখলদারদের বাঁচাতেই তালিকা প্রকাশে বিলম্ব করা হচ্ছে।
জানা যায়, ‘নদীদূষণ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং অন্যান্য দূষণ থেকে ৪৮ নদী রক্ষা ও তথ্যভাণ্ডার তৈরি ও সমীক্ষা (প্রথম পর্ব)’ শীর্ষক তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেয় এনআরসিসি। ব্যয় ধরা হয় ৩৩ কোটি টাকা। ২০২২ সালে প্রকল্প শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়, যেখানে নদী দখলদার হিসেবে অনেক প্রভাবশালীর নাম উঠে আসে। তুলে ধরা হয় ৩৭ হাজার ৩৯৬ নদ-নদী দখলদারের তথ্যও। তবে তথ্যগত ভুলের কারণ দেখিয়ে ওই তালিকা নিজেদের সার্ভার থেকে সরিয়ে ফেলে এনআরসিসি। এমনকি সংস্থাটি বৈঠক করে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি ওই সময় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে এনআরসিসির পক্ষ থেকে গত বছরের জানুয়ারিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানানো হয়, তথ্যগত ভুল থাকায় আরো যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে। সেই ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তা আজও প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি আদৌ প্রকাশ করা হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ প্রকল্পসংশ্লিষ্টরাই।
নদী সমীক্ষা প্রকল্পে পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন মুনির হোসেন চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নদী রক্ষা কমিশন আজও আমাদের সুনির্দিষ্ট করে বলেনি প্রতিবেদনের কোথায় ভুল ছিল। আমরা তো জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই প্রতিবেদন করেছি। এখন আবার জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে তথ্য যাচাই করার নামে সময়ক্ষেপণ করা আসলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার মতলব বলেই মনে হচ্ছে।’
প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে এনআরসিসির চেয়ারম্যান কামরুন নাহার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তথ্যে যেন কোনো অসংগতি কিংবা কারো আপত্তি না থাকে সেজন্য আরো যাচাই-বাছাই করছি। জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে তালিকাটি পাঠিয়েছি। সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। কোনো কোনো জেলা থেকে এরই মধ্যে আমাদের কাছে তথ্যও এসেছে। সেগুলো আমরা দ্রুতই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করব। সব যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।’
শুরুতেই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার পেছনে কমিশনের সদস্যদের বক্তব্য ছিল, হাইকোর্টের এক রায়ে সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে পানি আইন ২০১৩-এর ভিত্তিতে। এ কারণে চিহ্নিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ও তালিকা কমিশনে দেয়া প্রতিবেদনে এবং ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত হয়।
প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার বছর ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রতিবেদনটি নিয়ে এনআরসিসি এক বৈঠক করে। এর কার্যবিবরণী থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সভায় এনআরসিসির সদস্য মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সিএস রেকর্ড মোতাবেক অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত হয়নি সমীক্ষায়। সে কারণে চিহ্নিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ও তালিকা কমিশনের প্রতিবেদন ও ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না এবং তা প্রকাশও করা যাবে না।’
সভায় প্রায় একই কথা বলেন এনআরসিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীও। তিনি বলেছিলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক সিএস অনুযায়ী না করে পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী নদীর অবৈধ দখল বা নদীতীরবর্তী স্থাপনার তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকা প্রকাশ করলে আইনগত ও প্রশাসনিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ৩০০ কপিতে নদীর অবৈধ দখল, নদীতীরবর্তী স্থাপনার নাম, তথ্য অথবা সংখ্যা কোনোটিই প্রকাশ করা যাবে না। ওয়েবসাইটেও ওই অংশ বাদ দিয়ে প্রকাশ করতে হবে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, শুধু সিএস ম্যাপ নয়, বরং পানি আইন, ভূমি আইনসহ জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করে সমীক্ষা করা হয়েছে। ১৯৪০ সালে করা সিএস রেকর্ডে চিহ্নিত সব নদ-নদীর অবস্থান এখন আগের জায়গায় নেই উল্লেখ করে তারা জানান, পানি আইনে নদীর সীমানা ও ফোরশোরকে (তীরবর্তী ভূমি) সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আবার আলোচিত প্রকল্পটিতে দখলদারদের চিহ্নিত করতে শুধু পানি আইন নয়, বন্দর আইন ও ভূমি আইনেরও সহায়তা নেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি দখলদার চিহ্নিত করতে জিপিএস ব্যবহার এবং সরজমিন পরিদর্শনও করা হয়েছিল।
৪৮ নদ-নদী সমীক্ষা প্রকল্পটি হাতে নেয়ার সময় এনআরসিসির চেয়ারম্যান ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মুজিবুর রহমান হাওলাদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পানি আইন ২০১৩-এ নদীর ফোরশোর ও বন্যাকালীন পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আলোচিত প্রকল্পটি আমার সময়ই নেয়া। এর বড় অংশও আমার সময়ই হয়েছে। এর পরও আমি এটির সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলাম। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা নিজেদের মনগড়া কোনো তালিকা জমা দেননি। তারা জেলা প্রশাসক, তহশিলদার, মৌজা ম্যাপ, স্পারসোসহ সব ধরনের তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন করেছেন। এ প্রতিবেদনের একটি তথ্যও ভুল বলার কোনো সুযোগ নেই।’
নদী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন নদী গবেষক মোহাম্মাদ এজাজ। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এ চেয়ারম্যান বলেন, ‘৪৮ নদ-নদী সমীক্ষা প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া সঠিক ছিল। হাইকোর্ট শুধু সিএস রেকর্ড নয়, আরএস খতিয়ান ও পানি আইন আমলে নিয়ে নদী ও নদীতীরবর্তী স্থানে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে বলেছিলেন। ভূমি আইন, পানি আইন, ফোরশোরের আইনি সংজ্ঞা এবং ফৌজদারি আইন অনুযায়ী নদী ও নদীতীর দখল করা অপরাধ। মূলত দখলদারদের বাঁচাতেই তালিকাটি প্রকাশ করতে নদী রক্ষা কমিশন গড়িমসি করছে বলে আমরা শঙ্কা করছি।’
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনআরসিসি স্বতন্ত্রভাবে কাজটি করেছে। আমরা তাদের বলেছিলাম মন্ত্রণালয়ে যেন রিপোর্টটি পাঠানো হয়। আমরা সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে কাজ করতে পারতাম। কিন্তু কমিশনের রিপোর্ট কমিশনের কাছেই রয়ে গেছে। তাই এটা সরকারি কোনো ডকুমেন্টস হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটা শুধু একটা গবেষণাকর্ম। আপনারা এনআরসিসির গবেষণাকর্ম হিসেবে এর তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। সরকারি তথ্য হতে হলে এটা অবশ্যই গেজেট আকারে প্রকাশ হতে হবে।’