এলডিসি উত্তরণ পেছানোর কোনো অভিপ্রায় ও উদ্যোগ নেই সরকারের

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু কভিডের কারণে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় দুই বছর।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু কভিডের কারণে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় দুই বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বাংলাদেশের।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন সময় এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী মহল। গত ২৪ আগস্ট দেশের শীর্ষ ১৬টি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দিতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর কোনো উদ্যোগ তাদের নেই।

চলতি বছর ১৩ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে। এ প্রক্রিয়া মসৃণ করতে কৌশল বাস্তবায়নে গঠিত হয় স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) কমিটি। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী) আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. মনজুর হোসেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রফতানি অনুবিভাগ) মো. আবদুর রহিম খান, গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অর্থবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান কাজী ইকবাল।

কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া পেছানোর কোনো উদ্যোগ নেই। জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন গতকাল রাতে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‍এলডিসি থেকে উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলমান। তবে উত্তরণ হবে নাকি পিছিয়ে দেয়া হবে, সে বিষয়ে হয়তো পরবর্তী সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এ মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে পেছানোর কোনো উদ্যোগ নেই।’

কমিটির আরেক সদস্য রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি কম। এলডিসিতে থেকে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে এ কথা ঠিক, কিন্তু সময় বাড়ানোটা পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনেক কঠিন কাজ। যতটুকু সময় হাতে আছে তার মধ্যে চেষ্টা চালিয়ে সময় বাড়ানো যাবে কি না, সেটাও একটা বিষয়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফের পরে সারা বিশ্ব অনেক বেশি কম্পিটেটিভ হয়ে গেছে। সেখানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক রূপান্তরের পরও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা কম নয়। রফতানি বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। রেমিট্যান্স বেড়েছে। কাজেই সময় পেছানোর জন্য দৃঢ় যুক্তি দেয়া বাংলাদেশের জন্য হয়তো কঠিন হবে। আমাদের একটা যুক্তিই তুলে ধরা যেতে পারে, সেটা হলো আমাদের ভালো প্রস্তুতি নেই। এই যুক্তিটা যথেষ্ট হবে কিনা তা প্রচেষ্টা চালিয়ে না গেলে বোঝা যাবে না।’

তবে এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই—এমন তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি লেখায় জানিয়েছিলেন এসটিএসের নেতৃত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী) আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি লিখেছিলেন, ‘‍জাতিসংঘের বিধিবিধানের কারণে এলডিসি উত্তরণে আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। যদি থাকেও তাতে আমাদের দিক থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না।’

জানা যায়, এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে দেশের আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি ঋণ নেয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্য গুনতে হবে বেশি সুদ। এছাড়া অর্থনৈতিক সক্ষমতায় উত্তরণের কারণে আকৃষ্ট হতে পারে বিদেশী বিনিয়োগ।

সংশ্লিষ্ট সরকারি একটি সূত্র নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত উত্তরণ পেছানোর আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেই। অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। একটা ধারণা ছিল এটা পেছানো যাবে না। কিন্তু জানা গেছে দুই-একটি শক্তিশালী যৌক্তিক ভিত্তি দেখাতে পারলে জাতিসংঘ বিবেচনায় নিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত কর্তাব্যক্তিদের মতামত শুনে বোঝা গেছে পেছানোটা অসম্ভব কিছু না। সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে কিনা এটা বলা যাচ্ছে না। যথাযথ পর্যায়ে আলোচনা হলে সেটা বলা যাবে। তবে সে ধরনের কোনো আলোচনার উদ্যোগ রয়েছে বলে আমার জানা নেই। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করছে সরকারের উচিত পেছানোর জন্য একটা পদক্ষেপ নেয়া, সেই জন্য তারা সরব হয়েছে। এখন সরকারের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিষয়ে মূল সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাতে চায়, তাহলে সিডিপির কাছে আবেদন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কী কারণে বাংলাদেশ এমনটা চাচ্ছে সেটার যুক্তিসংগত কারণ দাঁড় করাতে হবে। ২০২১ সালে যখন বাংলাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন মাথাপিছু আয় বা মানবসম্পদ সূচক বা অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচক—সব সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান এলডিসি উত্তরণকে সমর্থন করছিল। ফলে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। এখন বাংলাদেশ যদি পেছানোর আবেদন করে, তাহলে তা বিচার করা হবে সেই সূচকগুলোর সাপেক্ষে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বলতে পারে যে আমাদের দেশে বড় পরিবর্তন হয়েছে। আমরা প্রস্তুতি নিতে পারিনি। তাই আরো সময় দরকার। আমরা উত্তরণ হলেও তা টেকসই করতে পারব না। এগুলো নিয়ে যুক্তি দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশ সিডিপি বরাবর আবেদন করতেই পারে। সেটা তারা বিবেচনা করবে। তারপর ইকোসক (ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল) হয়ে সাধারণ পরিষদের কাছে যাবে।’

তবে এ আবেদন করলে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সাল থেকেই জানি যে ২০২৪-এ গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা ছিল। ফলে প্রস্তুতি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আবেদন করে যদি তিন বছর সময় পাওয়া যায়, তার পরও গ্র্যাজুয়েশন হবে ২০২৯ সালে। সেই সময়ের মধ্যে তো প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। আবেদন করা যেতেই পারে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আবেদনের পক্ষে বিশেষ করে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে যথেষ্ট শক্ত যুক্তি দাঁড় করাতে হবে।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে গ্র্যাজুয়েশন হলে বাংলাদেশের শিল্প, রফতানি ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারালে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দেশীয় অর্থনীতির নানা চাপ বিবেচনায় এখনই এ গ্র্যাজুয়েশন বাংলাদেশের জন্য টেকসই হবে না।

গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর একটি হোটেলে ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড’ শীর্ষক এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পেছানোর দাবি জানিয়েছেন ১৬টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। সফল ও টেকসই এলডিসি উত্তরণের জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন জানিয়ে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের জন্য মাত্র ১৫ মাস সময় রয়েছে।’

জানতে চাইলে এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে নতুন দায়িত্ব ও ঝুঁকি আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বড় বড় বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। ফলে রফতানি কমতে পারে ৬-১৪ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ সুবিধার অবসান হতে পারে। এলডিসি হিসেবে রফতানিতে ভর্তুকি ও বাণিজ্যবিষয়ক মেধাস্বত্বের চুক্তি বাস্তবায়নে শিথিলতাসহ যেসব সুবিধা ছিল তা আর পাওয়া যাবে না। ফলে ওষুধ শিল্পে পেটেন্টের নিয়ম আরো কঠোর হবে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে। ফলে ওষুধের দামও বাড়বে। কাঁচামালের উৎসবিধি বা রুলস অব অরিজিন কঠোর হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া সহজ শর্তের ঋণ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে বাজারভিত্তিক ঋণ নিতে হবে, এতে ঋণ শোধের চাপও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের আওতাধীন আইডিএর নমনীয় ঋণের সুবিধাও হারাবে বাংলাদেশ।’

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর দাবি জানানো সংগঠনগুলো হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি), বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই), বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই), মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি), চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই), তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই), নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি)।

আরও