পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতায় উন্নতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অনুদান প্রতিশ্রুতি কমিয়ে দিয়েছে দাতা সংস্থা ও দেশগুলো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমেছে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ। সামনের দিনগুলোয় এর মাত্রা আরো হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেক্ষেত্রে দেশে সক্রিয় দাতাদের অনুদাননির্ভর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) ভবিষ্যতে কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে বিপাকে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আগামী কয়েক বছরের জন্য প্রায় ১২০ কোটি ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। এসব অর্থায়নে নেয়া কার্যক্রমগুলো সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি এনজিওগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।
তবে সামনের দিনগুলোয় দাতা সংস্থাগুলোর অনুদানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ইআরডির প্রতিবেদনে। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ১৫৭ কোটি ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৫ টাকা ধরে বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছরে এ অনুদানের প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে ৫৮ কোটি ৩৯ লাখ ৬২ হাজার ডলারে, যা টাকার অংকে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৯৬৪ কোটি। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে দাতাদের অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমেছে প্রায় ৬২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সরকারি প্রকল্প কিংবা কর্মসূচিতে অনুদানের অর্থায়ন কমার তেমন কোনো প্রভাব না পড়লেও উদ্বেগে রয়েছে এনজিওগুলো। দেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থায়নের একটি অংশ এখনো অনুদাননির্ভর। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাজ্য সরকারের ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি)। সরকারি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কিংবা বেসরকারি খাতগুলোর জন্য অনুদানের নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে আস্থাশীল প্রতিষ্ঠান ডিএফআইডি।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এনজিও ব্র্যাক দেশে ডিএফআইডির অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। ডিএফআইডির কাছ থেকে অনুদানপ্রাপ্তি কমে গেলে ব্র্যাকের অনুদাননির্ভর কার্যক্রমে অর্থায়ন সংকুচিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্র্যাকের সঙ্গে ডিএফআইডির পাঁচ বছরের কৌশলগত চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের মার্চে। এ অবস্থায় ডিএফআইডির সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বেশ উদ্বেগে রয়েছে সংস্থাটি।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমে আসাটাকেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। ইআরডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানালেন, সামনের দিনগুলোয় দেশে অনুদানের পরিমাণ আরো কমবে।বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কভিড পরিস্থিতিতে হয়তো বাংলাদেশ আরো অনুদান পেতে পারত। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশগুলো আমাদের সক্ষমতা দেখেই ঋণ প্রদানে আগ্রহী হয়েছে। তবে অনুদানের অর্থায়ন বন্ধ হলেও এর বিকল্প সব ধরনের উৎস ব্যবহারের উদ্যোগ চালু থাকবে।
আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিক্ষার মান উন্নয়ন, অপুষ্টির সমস্যা প্রতিরোধ, দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ কিংবা বৈষম্য কমিয়ে আনতে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচিতে অনুদান দিয়ে থাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত বছরও দুটি কর্মসূচিতে ১৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো অনুদান দিয়েছিল ইইউ। এর মধ্যে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ১ কোটি ইউরো ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে ১৩ কোটি ২০ লাখ ইউরো ব্যয় করার কথা। সামনের দিনেও সংস্থাটি থেকে অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমার শঙ্কা রয়েছে।
কভিড-১৯ মোকাবেলায় গত বছরের ৭ মে ৫০ কোটি ও ৩০ এপ্রিল ১০ কোটি ডলার ঋণ দেয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রায় ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে এ খাতে সংস্থাটি অনুদান দিয়েছে মাত্র ২৯ কোটি টাকা। যদিও এডিবি থেকে বড় ধরনের অনুদানের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের। তবে ঝুঁকি ও সক্ষমতা বিবেচনা করেই বাংলাদেশকে এভাবে অর্থায়ন করেছে এডিবি।
প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা উপখাতের মান, প্রাসঙ্গিকতা ও দক্ষতার উন্নয়নে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-৪ (পিইডিপি-৪) শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পে ২০ কোটি ৫৫ লাখ ইউরো অনুদান দেবে ইইউ। বাজেট সহায়তা হিসেবে ২০ কোটি এবং কর্মসূচিটির পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও অডিটের জন্য ৫৫ লাখ ইউরো। সব মিলিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৯২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার অনুদান দেবে ইইউ। যদিও এ প্রকল্পে অনুদানের অর্থের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল। সামনের দিনে অনুদানের প্রতিশ্রুতি আরো কমে গেলে এ ধরনের নতুন প্রকল্প অর্থায়ন জটিলতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছিল বৈদেশিক অর্থায়নে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় অনুদাননির্ভর অর্থায়নের বিষয়টি একেবারেই গৌণ হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ গৃহীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থান হবে প্রায় ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের অবদান থাকবে মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, আমরা এখন বৈদেশিক অনুদানের ওপর অতটা নির্ভরশীল নই। নিজেদের সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি। বৈদেশিক অর্থায়ন ও অনুদানকে একেবারেই নিরুৎসাহিত করব না। কোনো দেশ বা সংস্থা অনুদান দিতে চাইলে সুবিধাজনকভাবে তা গ্রহণ করা হবে।
তবে অনুদান কমলেও বাংলাদেশের সক্ষমতা বিবেচনায় ঋণের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ৮৩৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার ডলার, যা গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে উন্নীত হয়েছে ৯২১ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার ডলারে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৮৭ লাখ ৮৯ হাজার ডলার।