তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও মূল্যস্ফীতিও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতি মাসে কার্ড ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গতকাল প্রকাশিত জুনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওই মাসে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০২৫ সালের জুনে ছিল ৩ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধির হিসাবে যা ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এসব লেনদেনের ৯১ দশমিক ১১ শতাংশই ব্যবহার হয়েছে কেনাকাটায়। এর বাইরে নগদ টাকা উত্তোলনে ৭ দশমিক ১১ ও অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহার হয়েছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ক্রেডিট কার্ডে ৯০ শতাংশেরও বেশি লেনদেন কেনাকাটায় ব্যবহৃত হলেও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেডিট কার্ড থেকে মোবাইলভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় টাকা লেনদেন ই-কমার্সের কেনাকাটা হিসেবে শ্রেণীভুক্ত হয়। এতে লেনদেনের বড় একটি অংশ আসলে কেনাকাটায় ব্যবহৃত হয় কিনা তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায় না।
দেশে ক্রেডিট কার্ডসেবায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কার্ডসেবা আমেরিকান এক্সপ্রেস বা অ্যামেক্স কার্ডের একমাত্র বাংলাদেশী প্রতিনিধি সিটি ব্যাংক। এ কার্ডের মাধ্যমেই তারা তাদের ক্রেডিট কার্ডের সেবা বিস্তৃত করেছে। যদিও ভিসা, মাস্টারকার্ডসহ অন্যান্য সেবাও রয়েছে। বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেছে সিটি ব্যাংক। তাদের ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৭ লাখ ২৩ হাজার ৮৩০।
ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মো. অরূপ হায়দার বলেন, ‘দেশের ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বাড়ছে, এটি সত্য। তবে বিষয়টিকে এত সাদামাটাভাবে দেখা উচিত হবে না। এমএফএসে অ্যাড মানি ই-কমার্স লেনদেন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ অর্থ পরে কেনাকাটায় ব্যবহার হয় নাকি নগদ উত্তোলন হয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। গত বছর সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গড় প্রবৃদ্ধি ১৫-১৮ শতাংশ হলেও বর্তমানে সেটি প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে এমএফএস লেনদেনও বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। এর বাইরেও নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া, কিউআরের প্রসার বেড়ে যাওয়া এবং ছোট ছোট লেনদেন বাড়ার ফলেও সার্বিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’
দেশে কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। সে অনুসারে মানুষের বেতন বাড়েনি, উল্টো কর্মসংস্থানে তৈরি হয়েছে নানা চাপ। অনেকেই ধারদেনা ও ঋণ নিয়েই সংসার চালাচ্ছেন। আগে মানুষ কেনাকাটার জন্য ক্রেডিট কার্ড নিলেও বর্তমান পরিস্থিতি একই রকম নয়। ক্রেডিট কার্ডে ঋণ পেতে কোনো ধরনের জামানত রাখতে হয় না। ফলে অনেকেই এখন ক্রেডিট কার্ড থেকে ঋণ নিয়েও সংসার চালাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও এর যথার্থতা পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ স্থিতি ছিল প্রায় ৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাসে এ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় তিন বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ স্থিতি প্রায় দেড় গুণ হয়েছে।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তৌফিকুল ইসলাম। আগে ওয়ান ব্যাংকের একটি ক্রেডিট কার্ড থাকলেও সম্প্রতি তিনি সিটি ব্যাংক থেকে আরেকটি কার্ড নিয়েছেন। কার্ড হাতে পাওয়ার পরই সেখান থেকে পুরো টাকা উত্তোলন করে তিনি ঋণ পরিশোধ করেছেন। তৌফিকুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার প্রচুর টাকা ঋণ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে জামানত দেখাতে হয়। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডে জামানত লাগে না। ফলে আমি আরেকটি কার্ড নিয়ে সেখান থেকে এমএফএসে টাকা নিয়ে আমার ধার শোধ করেছি। এখন মাসে মাসে মিনিমাম ডিউ দিয়ে তা সচল রাখব।’
দেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজারে ব্র্যাক ব্যাংকের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। বেসরকারি খাতের ব্যাংকটির কার্ড ও গ্রাহক সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ঋণনির্ভর এ কার্ডের লেনদেন বাড়ার বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, 'অর্থনীতির আকার ও জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজার বেশ ছোট। নানা কারণে এ সংখ্যা বাড়েনি। এর মধ্যে উচ্চ সুদহার একটি। দেশে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ সীমাবদ্ধতা কমে এসেছে। ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বৃদ্ধিতে এর প্রভাব থাকতে পারে।'
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বেতন-ভাতা না বাড়ার প্রভাবেও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে মনে করেন এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ডের ঋণস্থিতি বেড়ে গেলে সেটি শঙ্কার। এর প্রভাবে খেলাপী ঋণও বাড়তে পারে। যদি তেমনি হয়, তাহলে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকা দরকার।’
দেশের ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো বাড়ার কারণেই ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে কিউআর কোডসহ সার্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। মার্চেন্ট পর্যায়ে পিওএস মেশিনের পরিধি বৃদ্ধি এবং এমএফএসের সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি হওয়ায় মানুষ এখন নগদ টাকার চেয়ে কার্ড বা ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এটি দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যকে আরো গতিশীল করছে।’