ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে কুয়ালালামপুরে পৌঁছার পর গত সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজের উইন্ডশিল্ডে ফাটল শনাক্ত হয়। যার কারণে ফিরতি ফ্লাইটটি বাতিলও করতে হয়। উইন্ডশিল্ড পরিবর্তন করে বাহনটি দেশে ফিরিয়ে আনতে গতকাল মালয়েশিয়ায় উড়ে গেছেন বিমানের প্রকৌশলী। কেবল উইন্ডশিল্ডে ফাটল নয়, প্রায়ই বোয়িং-৭৩৭ মডেলের এ বাহনটিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা শনাক্ত হয়। জানা গেছে, এটি বাংলাদেশের নিজস্ব বাহন নয়, ১০ বছরের জন্য উড়োজাহাজটিকে ভাড়ায় আনা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষে সমস্যাসংকুল এ বিমানটিকে ফিরিয়ে না দিয়ে উল্টো কেনার পরিকল্পনা চলছে। তবে বিমানের একটি সূত্র বলছে, করোনাকালে কার্গো পরিবহনের কারণে বাহনটির অভ্যন্তরে বেশকিছু ক্ষতি হয়েছে। তাই এটি আর ফিরিয়ে নিতে চায় না মালিক প্রতিষ্ঠান।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি ০৮৬ ফ্লাইটটি। যেটিতে ছিলেন ১২৬ জন যাত্রী, দুই বৈমানিক ও চারজন কেবিন ক্রু। বোয়িং-৭৩৭ মডেলের এ উড়োজাহাজটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর হলো এস২-এএফএম। পরদিন অর্থাৎ গতকাল ভোরে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর উড়োজাহাজটির উইন্ডশিল্ডে ফাটল দেখতে পান বৈমানিক ক্যাপ্টেন শাখাওয়াত হোসেইন। বিষয়টি বিমান কর্তৃপক্ষকে জানালে মেরামতের জন্য কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে গ্রাউন্ডেড করা হয় উড়োজাহাজটি।
কুয়ালালামপুর থেকে ফিরতি ফ্লাইটটির ১৪৬ জন যাত্রী নিয়ে গতকাল দেশে রওনা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু উইন্ডশিল্ডে ফাটলের কারণে উড়োজাহাজটি গ্রাউন্ডেড করা হলে বাতিল হয় বিজি ০৮৭ ফ্লাইটের যাত্রা। পরে গতকাল ঢাকা থেকে আরেকটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ কুয়ালালামপুরে পাঠানো হয়। যেটি কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে আটকে থাকা বিজি ০৮৭ ফ্লাইটের যাত্রীদের গত রাতে ঢাকায় নিয়ে আসে।
বিমানের প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল ঢাকা থেকে বিশেষ যে ফ্লাইটটি কুয়ালালামপুরে গিয়েছে, সেটিতে বিমানের প্রকৌশলীসহ এক সেট উইন্ডশিল্ড পাঠানো হয়েছে। প্রকৌশলীরা কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে গ্রাউন্ডেড হওয়া এস২-এএফএম উড়োজাহাজের ফাটল ধরা উইন্ডশিল্ড খুলে নতুন উইন্ডশিল্ড স্থাপন করবেন। সাধারণত বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজের উইন্ডশিল্ড খুলতে ও স্থাপন করতে ৪ ঘণ্টা করে সময় প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে গত রাতের মধ্যেই উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন উপযোগী করার আশা দেখছেন প্রকৌশলীরা। উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন উপযোগী হলে সেটি দিয়েই আজ কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকার ফ্লাইটটি পরিচালনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, এস২-এএফএম রেজিস্ট্রেশনের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজটি ২০০৯ সালের অক্টোবরে আয়ারল্যান্ড থেকে ইজারায় নেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সম্প্রতি এ উড়োজাহাজটি কেনার অনুমতি পেতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। উড়োজাহাজটির দাম ধরা হয়েছে ৯৭ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার করে। সে হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় উড়োজাহাজটির দাম পড়বে ৮৩ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৬২৫ টাকা। ওই সময় আয়ারল্যান্ড থেকে আরো একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ ইজারা নিয়েছিল বিমান। যেটির রেজিস্ট্রেশন নং এস২-এএফএল। একই দামে ওই উড়োজাহাজটিও কেনার অনুমতি চেয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। উড়োজাহাজ দুটি কিনতে আয়ারল্যান্ডের সেলেসটিয়াল এভিয়েশন ট্রেডিং লিমিটেডের সঙ্গে গত ২৩ ডিসেম্বর একটি চুক্তিও করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, নভেল করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর শুরুতে যখন যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ ছিল, সে সময় এস২-এএফএম ও এস২-এএফএল রেজিস্ট্রেশনের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ দুটি ব্যবহার করে কার্গো পরিবহন করা হয়। এটি করতে গিয়ে উড়োজাহাজ দুটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাসহ বিভিন্ন মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ক্ষতি হয়। এ কারণে ভাড়ায় আনা এ দুটি বাহন আর ফেরত নিতে চায় না মালিক প্রতিষ্ঠান। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই উড়োজাহাজ দুটি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বিমান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এর পেছনে একটি পক্ষের যোগসাজশ রয়েছে। উড়োজাহাজগুলোর ক্ষতি করা পক্ষটিতে বিমানের একজন পরিচালক, একজন বৈমানিক ও কার্গো শাখার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার কথাও জোর দিয়ে বলেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকারও সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।