দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এমএসএমই) উদ্যোক্তারা। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ২৫ শতাংশ আসছে এ খাতের উদ্যোগগুলো থেকে। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতি প্রাণবন্ত রাখার ক্ষেত্রেও চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে খাতটি। অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও অর্থায়ন, নীতিনির্ধারণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমএসএমই খাত অবহেলিতই থাকছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তারা বলছেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এমএসএমই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস ২০২৫ উপলক্ষে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবন; মূল চালিকাশক্তি এমএসএমই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের (এসএমই) চেয়ারপারসন মো. মুসফিকুর রহমান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদেরসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, শীর্ষ নির্বাহী, উদ্যোক্তাসহ বিশিষ্টজনরা অংশ নেন।
আলোচকদের বক্তব্যে দেশের এমএসএমই খাতের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে। তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান এমএসএমই খাতকে অর্থায়নে জোর দিলেও মূলত এ খাতের মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন। ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা ঋণপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই অবহেলার শিকার হচ্ছেন। আবার দেশের বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এমএসএমই খাতের সুযোগ-সুবিধা ভাগিয়ে নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে এ খাত থেকে মাঝারি উদ্যোগগুলোকে বের করে আনতে হবে। মাঝারি উদ্যোক্তাদের পরিসংখ্যান ও অর্থায়ন পৃথক হিসাবায়নের আওতায় নিয়ে এলে এমএসএমই খাতের প্রকৃত উদ্যোক্তারা লাভবান হতে পারবেন বলে মত দেন তারা।
আলোচনা সভায় ‘ক্লাস্টার’ভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো, ‘ক্রাউড ফান্ডিং’, ‘সার্কুলার ইকোনমি’ চালুর মতো আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রস্তাব আসে। আবার এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা, কৃষকদের কৃষি কার্ড দেয়া, মার্কেট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, আরো বেশি কোল্ডস্টোরেজ তৈরি করার বিষয়েও মতামত এসেছে। বক্তারা বলেছেন, সিএসএমই খাতকে আরো শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হলে দেশের মানুষকে দেশী পণ্য ব্যবহারে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হতে হবে। বিদেশী পণ্যের ব্যবহার কমে এলে দেশী পণ্যের বৈচিত্র্য ও গুণগত মান বাড়বে। এতে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশী সিএসএমই পণ্যের রফতানি চাহিদাও তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কায়সার হামিদ, আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান দাউদ সামস, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ প্রমুখ। বণিক বার্তার এ আয়োজনে প্রধান সহযোগী হিসেবে ছিল পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং সহযোগিতায় ছিল আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স পিএলসি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনীতিতে এমএসএমইর ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। দুর্ভাগ্যবশত পৃথিবীর সব দেশেই এ খাত কিছুটা অবহেলিত। সেজন্যই জাতিসংঘ থেকে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য একটি দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা পৃথিবীর জন্যই। আমরা দেখতে পাচ্ছি এমএসএমই প্রতিটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।’
তিনি বলেন, ‘এ খাত অবহেলিত হওয়ার কারণ হচ্ছে এমএসএমই অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো দৃশ্যমান নয়। ঘরে বসে কাজ করছেন কেউ, কেউ ছোট্ট একটি দোকান নিয়ে আছেন। আর শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক বড় কারখানা নিয়ে কাজ করে, যেটা দৃশ্যমান। আমার মনে হয়, এসএমই হচ্ছে—দাঁত আছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু যখন থাকবে না তখন বিপদ। তাই দেখা যাচ্ছে না বলে এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি যখন বেড়ে যায়, তখন সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমএসএমই খাত। এর প্রভাবে তখন বেকারত্বও বেড়ে যায়।’
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করলে আমরা এই ওই সুবিধা পাব না—এসব বলা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো কিন্তু আমাদের এ সুবিধা দিতে চায়নি। অনেক দেনদরবার করে এটি নিতে হয়েছে। ১৯৬০ সাল থেকে এ লড়াই চলছে। এখন আমাদের কাছে দাবি এসেছে তিন বছর পেছানোর জন্য। এটি করা যায়, কিন্তু আপনাকে তো রোডম্যাপ দিতে হবে। এখন পারছেন না, তিন বছর পরে কীভাবে পারবেন সেটি দেখাতে হবে। অফিশিয়ালি তো আমরা ২০২৪ সালে গ্র্যাজুয়েট হয়ে গিয়েছি। কিন্তু কভিডের কারণে ইউএন বলেছে, ঠিক আছে ২৪-এর জায়গায় ২৬-এ নিয়ে নেন।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসএমইর অধীনে। খাতটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ। ফলে দেশের কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ তৈরি করে এসএমই খাত। ১০টি চাকরির মধ্যে সাতটিই তৈরি করে এ খাত। তবে এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও অনেক কাঠামোগত সমস্যার কারণে এ খাত পিছিয়ে আছে। যেমন প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের অভাব, দক্ষ জনশক্তির অভাব, বাজার সম্প্রসারণে বাধা এবং ডিজিটাল রূপান্তরে ধীরগতি। তার মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে। অথচ এ খাতের সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা গ্র্যাজুয়েট ঠিকই করছি, অনেকটা নকল করে গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাচ্ছি মনে হচ্ছে। গ্র্যাজুয়েট হলে আমাদের পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা অনেকাংশেই কমে যাবে। মেধাস্বত্ব আইন, অ্যান্টি ডাম্পিং নীতিমালাসহ অনেক সীমাবদ্ধতা দেখা দেবে। সেক্ষেত্রে আমি ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য এবং কিছু কৌশলগত নীতি বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করি। প্রথমত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি এবং নতুন একটি আর্থিক মডেল গড়ে তোলা। উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ব্যবসায় পরিচালন জ্ঞান বৃদ্ধিতে প্রচুর প্রশিক্ষণ চালু করা। রফতানিমুখী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা। ডিজিটাল প্লাটফর্মে সিএমএসএমইদের সংযুক্ত করতে ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আইসিটি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও নীতিমালা করা, কার্যক্রম সহজ করা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মো. মুসফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোয় যদি ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়াতে না পারি তাহলে জটিলতা বাড়বে। কারণ একসময় দেখা যাবে অর্থনীতির খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আমরা এজন্য সরাসরি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করছি। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করছি। পণ্যের বৈচিত্র্য আনতেও আমরা কাজ করছি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য একটি সার্কুলার দিয়েছে। এটি খাতটিকে এগিয়ে যেতে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, ‘সবাই টেকসই প্রবৃদ্ধি চায়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। সেই জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে। এখানে বিনিয়োগ প্রয়োজন, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন, নীতিমালায় পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রয়োজন। সেখানে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত দিক এবং পণ্যে মার্কেটিং নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।’
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কায়সার হামিদ বলেন, ‘ছোট ঋণের ক্ষেত্রে জমি মর্টগেজের প্রক্রিয়াটা খুবই জটিল। এটি ব্যয়সাপেক্ষ। আমাদের পক্ষেও বিষয়টি অনেক সময়সাপেক্ষ। কারণ জমির বিস্তারিত দলিলপত্র যাচাই করে এটিকে মর্টগেজ করা প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়া পুরোটাই ম্যানুয়াল। ডিজিটাল নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, এনআইডি, টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এখনো একটা জমি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকে সিল মর্টগেজ করা সম্ভব। আমাদের বড় ঝুঁকিটা এখানে। ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা নিয়ে আমরা এ ঝুঁকির সমাধান করতে পারছি না। ফলে পুরো সিস্টেমে ডিজিটালাইজেশন আমার কোনো উপকারে আসছে না। ২০২০ সালে এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণ ছিল ১ লাখ ২০ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যেটা ৩ লাখ কোটি টাকা হয়ে গেছে ২০২৪-এর শেষে এসে। কিন্তু ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ অংকটা বাড়েনি। এর কারণ তৃণমূল পর্যায়ে এনজিওগুলোকে সহজে পাওয়া যায়। কারণ ঋণগ্রহীতা টাকাটা চায়। তার প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনমতো করে চায়। যেখানে ব্যাংকের থেকে এনজিওগুলো এগিয়ে। ফলে ব্যাংকগুলোকে এক্ষেত্রে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘এসএমই খাতে মোট অবদানের মাত্র ৭ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা। আমাদের দেশে কিন্তু প্রায় ৮০ লাখের মতো এসএমই উদ্যোক্তা আছেন। আমরা দেখেছি, কভিডের সময় যখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে তখন কিন্তু এই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোই এগিয়ে এসেছে। মাস্ক তৈরি করা থেকে শুরু করে খাবার রান্না করে ডেলিভারি করা ইত্যাদি। তারা কিন্তু তখন বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। এখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে যেসব স্বত্ব আরোপ হবে, তখন এই এমএসএমইদের কী অবস্থা হবে? এটি নিয়ে আমাদের এখনই চিন্তা করে কোনো একটি সমাধান বের করা উচিত নয় কি?’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘আমরা সবাই একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি। সেটি হচ্ছে এটা কি এসএমই, নাকি এমএসএমই, নাকি সিএমএসএমই, কোনটি হবে? এই ব্যাখ্যটা সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত, না হলে সমস্যা হচ্ছে। আমরা নিজেরা একটা আলোচনা করেছি। সেখানে সিএমএসএমই কেন কাজ করছে না সেটি বুঝতে চাইলাম। আমরা দেখলাম আন্তর্জাতিকভাবে কোথাও এভাবে বলা হয় না। এটা এমএসই হয়। মনে হয়, এ জায়গায় আমাদের পরিষ্কার হওয়া উচিত। আমাদের লক্ষ্য কিন্তু মাঝারিরা নয়, আমাদের লক্ষ্য ক্ষুদ্রদের এগিয়ে আনা। কারণ এ সংজ্ঞাগত সমস্যার কারণে ক্ষুদ্ররা কিন্তু খুব একটা ঋণ পায় না, মাঝারিরাই পায়।’
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, ‘এসএমই খাত নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ডাটাবেজ নেই। আমরা এখনো এসএমই খাতের উদ্যোক্তার সংখ্যা জানি না। এখনো ২০১৩ সালের ডাটার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কারা মূলত এসএমই—সেই জায়গাটি আমাদের আগে খুঁজে বের করতে হবে। সেজন্য আমি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এসএমই ফাউন্ডেশনকে অনুরোধ করব তারা যাতে একটি আপডেট ডাটাবেজ তৈরি করে। ক্লাস্টারগুলোও আরো সাজানো দরকার। উদ্যোক্তাদের কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রথমত, আমরা মাইক্রো বলতে কী বুঝি, স্মল বলতে কী বুঝি এবং মিডিয়াম বলতে কী বুঝি? এটা কি কর্মীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ হবে, নাকি বিনিয়োগের হার দিয়ে? একটা পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকলে সবারই কাজ করতে সুবিধা হয়। আমাদের এখানে অনেক বড় একটা গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ফলে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সত্যিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠা করার। তার মানে বিগত সময়ে প্রতিষ্ঠা করা অলিগার্ক শ্রেণীর অর্থনীতি থেকে দেশকে বের করে এনে আমরা প্রান্তিক মানুষের অর্থনীতি নির্মাণ করব। এক্ষেত্রে এমএসএমই অনেক বড় একটি ভূমিকা রাখতে পারে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘যারা এসএমই আছেন বা তৃণমূলে উৎপাদনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত, তাদের সবাইকে একটি সুতোর মালায় নিয়ে আসা যায় কিনা তা নিয়ে আমরা ভাবছি। শুধু এসএমইদের স্বার্থে নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই তাদের উন্নয়ন করা দরকার। এ কারণে আমরা এসএমইদের আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করছি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা এ কাজগুলো করছি।’
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ‘২০১৩-২০২৪, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বেড়েছে। মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তা কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েছে। এটা বাড়ানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেটির সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তারা। পলিসি মেকিংয়ের (নীতিনির্ধারণ) ক্ষেত্রে আমাদের আরো সতর্ক থাকতে হবে। ঢালাওভাবে এসব পলিসি দেয়াকে আমি সমর্থন করি না। এতে মোরাল হ্যাজার্ড তৈরি হতে পারে। এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংজ্ঞা নতুন করে তৈরি করার সময় এসেছে। খাতভিত্তিক এসের সংজ্ঞার ভিন্নতা রয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে অর্থায়নের সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে। এসের সঙ্গে এমের কাঠামোগত সম্পর্ক কী সেটিও পরিষ্কার করা লাগবে।’
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এসএমই উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তাদের নিজেদের ব্যবসা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকলেও আর্থিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা জানেন না কীভাবে মুনাফার হিসাব করতে হয়, ফিজিবিলিটি রিপোর্ট কীভাবে করতে হয়। আমাদের বিভিন্ন জেলায় ভোকেশনাল ট্রেইনার আছে, তারা বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এটির পাশাপাশি অন্ট্রাপ্রেনিউর ভেভেলপমেন্টশিপ নামে কোনো কোর্স রাখা যায় কিনা। তাদের বেসিক ফাইন্যান্সিয়াল নলেজ দেয়া যায় কিনা। আমাদের কাছে অনেক উদ্যোক্তা ঋণের জন্য আসেন। কিন্তু তাদের প্রপার ডকুমেন্টেশন থাকে না। এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তাদের বেসিক ডকুমেন্টেশনের ওপর নজর দেয়া দরকার।’
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান দাউদ সামস বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসএমইদের অর্থায়ন করতে চায়। তবে বিভিন্ন কারণে তা হয়ে ওঠে না। আমাদের যে ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক আছে, সিএসএমইতে ব্যবসা করতে গেলে তার যে খরচ হয় সেটি একটু বেশি হয়। সেক্ষেত্রেও যদি ডিজিটালাইজেশন আসে তাহলে আমাদের জন্য একটু সুবিধা হবে। আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানের পুরো দেশে ১৫-২০টির মতো শাখা রয়েছে। কিন্তু সিএসএমই উদ্যোক্তারা পুরো দেশে রয়েছেন। বেশির ভাগ উদ্যোক্তাই ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে। সেসব জায়গায় কাজ করতে গেলে আমাদের ডিজিটালাইজেশন খুব বেশি দরকার। সেটির জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তাও দরকার। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা পাচ্ছি। তবে আমাদের আরো কিছু সহযোগিতা দরকার। আমরা বিভিন্ন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, তাদের যেটি প্রয়োজন তা হলো অর্থায়নে প্রবেশাধিকার (অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স)। তবে আমরা বুঝেছি, উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশাধিকার (অ্যাকসেস টু মার্কেট), অ্যাকসেস টু বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ও অ্যাকসেস টু ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট দরকার।’
আলোচনা সভায় চারজন এসএমই উদ্যোক্তাও অংশ নেন। তারা হলেন বেনে বৌয়ের উদ্যোক্তা ফারহানা মুনমুন, ব্রাইডাল ক্রিয়েশনের উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, ট্যানের উদ্যোক্তা তানিয়া ওয়াহাব ও লাম ক্রিয়েশনের উদ্যোক্তা সাবেকুন্নাহার মিতু। এ উদ্যোক্তারা নিজেদের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। সেমিনারে তারা জানান, উদ্যোক্তাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মার্কেটিং (প্রচারণা)। দেশে ভালো কাঁচামাল থাকে। তবে মার্কেটিংয়ের কাজে বাজেটস্বল্পতার জন্য এসএমই উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে সেগুলো আরো সহজলভ্য করে দেয়া। কম খরচে যাতে মার্কেটিং করা যায় সেদিকে নজর রাখা, দেশীয় পণ্য ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা গেলে সেক্ষেত্রে মার্কেটিংয়ের একটি বড় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তারা বলেন, বিভাগীয় শহর ছাড়াও গ্রাম পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আরো বেশি প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পেলে গ্রাম পর্যায়ে আরো উদ্যোক্তা তৈরি করা যাবে। বছরে একটি বা দুটি করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেগুলো আরো বেশি করে দেয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি বলে জানান উদ্যোক্তারা।
অনুষ্ঠানের সমাপনী টানেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার। তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে একটি এসএমই মেলায় গিয়ে আমি বলেছিলাম, মেলার আয়োজন করে কেন এসএমই পণ্য প্রদর্শন করতে হবে। এটির জন্য তো স্থায়ী বিপণন সেন্টার থাকা উচিত। এ ধরনের সেন্টার তৈরি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থা আছে, তারা এসএমই পণ্য প্রদর্শন সেন্টার ও বিপণন কেন্দ্র তৈরি করতে পারে। এটি হওয়া উচিত। তাহলে এসএমই খাতের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটি কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এমএসএমই খাতের জন্য প্রশিক্ষণ ও ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
নূরুন নাহার বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এ খাতের জন্য গত মার্চে একটি মাস্টার সার্কুলার জারি করে। এটি তৈরির সময় আমরা সংশ্লিষ্টদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। এখন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তাহলে সে আলোকে সার্কুলার সংশোধন করা হবে। সমস্যা হলো, এ বিষয়ে অনেকেই এখনো জানেন না। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এমএসএমই সার্কুলার নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছি। ব্যাংকের শাখাসহ সবখানে এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর প্রচার করতে বলা হয়েছে। প্রচারণা ও সচেতনতার অভাবে অনেক সময় এমএসএমই উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে অন্ধকারেই থেকে যান। আগামী মাস থেকেই আমরা এ বিষয়ে কর্মশালা আয়োজনসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নেব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের চালু করা ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের নীতিমালা জটিলতা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগেরও জবাব দেন ডেপুটি গভর্নর। তিনি বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত সবকিছুই পাইলটিং ভিত্তিতে নেয়া হয়। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেসব প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়, সেগুলো সংশোধন করা হয়। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের নীতিমালা আরো কীভাবে সহজ করা যায়, সেটি আমরা দেখব। ক্রাউড ফান্ডিং ও সার্কুলার ইকোনমি চালুর বিষয়েও আলোচকদের পক্ষ থেকে কথা এসেছে। আমরা এরই মধ্যে ক্রাউড ফান্ডিং নিয়ে কিছু কাজ করেছি। সার্কুলার ইকোনমি নিয়েও কাজ করা যেতে পারে।’