১৯৪৭। ব্রিটিশ শাসনোত্তর পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মানুষের মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচল। ক্রমেই প্রকট হতে থাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য। তারই অনিবার্য পরিণতি পাকিস্তানের ভাঙন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তারপর পেরিয়েছে ৫০ বছর। স্বাধীনতা-উত্তর দুই দেশের বাস্তবতা বা পূর্বাপর বৃত্তান্ত। শেষ পর্ব
গত মাসেই পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে নেমে এসেছিলেন কৃষকরা। পাকিস্তানি পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান জেলার বিক্ষুব্ধ কৃষকরা দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কুশপুত্তলিকাও পুড়িয়েছেন। দেশটির অন্যান্য অংশে এবার কৃষকদের বিক্ষোভের মাত্রা একটু বেশি। এরই মধ্যে তাদের এ বিক্ষোভকে ‘বেজুবান জানোয়ার অ্যান্ড বেবাস কিসান মার্চ’ (বোবা জানোয়ার ও নিরুপায় কৃষকের মার্চ) বলে অভিহিত করছে কৃষক সংগঠনগুলো।
গত কয়েক বছর ধরে গোটা পাকিস্তানেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে দেখা যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যেকোনো সময়ে ভারতের মতো পাকিস্তানেও কৃষকরা মারাত্মক বিদ্রোহে ফুঁসে উঠতে পারে। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া দেশটির কৃষকদের জন্য চিরাচরিত এক সংকট। তাদের জন্য পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলেছে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব। এর মধ্যেই আবার দেশটির সরকার দফায় দফায় জ্বালানির মূল্য বাড়ানোয় কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ এ উত্তেজনার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে সারের ক্রমবর্ধমান দাম।
কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যেক ফলন মৌসুমেই পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম হয়। ঠিক যেমনটি দেখা যায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকদের অন্য পেশায় চলে যাওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেও অতি সাধারণ চিত্র। যদিও দুই দেশেই অর্থনীতির বড় স্তম্ভ ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধানতম ভরসা হলো কৃষি। ষাটের দশকে একযোগে শুরু হওয়া সবুজ বিপ্লব গত ছয় দশকে দুই দেশে কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়িয়েছে ঠিকই। কিন্তু দুই দেশের কোথাও আজ পর্যন্ত কৃষকের জন্য মুনাফাজনক উৎপাদনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা যায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় ষাটের দশক এসেছিল দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার অশনিসংকেত নিয়ে। এ আশঙ্কাকে আরো গভীর করে তুলেছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সম্ভাবনা। ওই সময় তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি এবং শস্যের নতুন উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে তত্কালীন পাকিস্তানের দুই অংশেই কৃষি উৎপাদন ছিল বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের গত ছয় দশকের কৃষি উৎপাদনের পরিসংখ্যানও সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-৬১ অর্থবছরে বাংলাদেশে দানাদার খাদ্যশস্য (চাল ও গম) উৎপাদন হয়েছিল ৯৭ লাখ ৪ হাজার টন। তা প্রথমবারের মতো কোটির ঘর ছাড়ায় ১৯৬৩-৬৪ অর্থবছরে। সে সময় দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৫৮ হাজার টন। মুক্তিযুদ্ধের সময় উৎপাদন কিছুটা কমলেও ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৬ হাজার টনে। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরের মধ্যে আবারো উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৮ হাজার টনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টনে।
শুধু দানাদার খাদ্যশস্য নয়, এ ছয় দশকে দেশে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও বহুলাংশে বেড়েছে। ১৯৬০-৬১ অর্থবছরে দেশে ডালজাতীয় শস্যের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার টন। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার টন। ২০১৯-২০-এ তা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার টনে। এছাড়া আলু ১৯৬০-৬১ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ও ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫৩ হাজার টন উৎপাদন হয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে অনেক গুণ বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ৯৬ লাখ ৬ হাজার টনে। এছাড়া সবজি উৎপাদনও ১৯৬০-৬১-এর ৫ লাখ ৮২ হাজার এবং ১৯৭১-৭২-এর ৪ লাখ ৮৬ হাজার থেকে কয়েক গুণ বেড়ে ২০১৯-২০-এ দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৭৫ হাজার টনে।
এ সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি ফসলের বৈশ্বিক উৎপাদনের শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। কৃষি উৎপাদনের এ অভূতপূর্ব সাফল্যের মধ্যেও দিন পরিবর্তন হচ্ছে না কৃষকের। অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের মানুষের জন্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করলেও অবহেলা বা বঞ্চনার মধ্য দিয়েই যেতে হচ্ছে কৃষককে। পণ্যের বিপণন সমস্যা ছাড়াও ক্ষুদ্রায়তনের জমি, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তিসহ কৃষি উপকরণের অভাব মোকাবেলা করতে হয় তাদের। এছাড়া জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও অর্থায়ন সমস্যাও নিয়মিতভাবে মোকাবেলা করতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ওই অঞ্চলের জীবন-জীবিকা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। এখনো প্রায় বছরই দেখা যায়, বাজার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কৃষক কোনো না কোনো ফসলের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না।
গত কয়েক দশকে কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দেয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অবহেলা রয়েছে কৃষিপণ্যের বিপণনে। উৎপাদন ও আবাদ এলাকা বাড়ানো নিয়ে পরিকল্পনা হচ্ছে অনেক। যদিও সরবরাহ বা বিপণন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বেশ অদক্ষতা রয়েছে। দেশের কৃষকরা বর্তমানে কয়েকশ ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করছেন। যদিও সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে মাত্র কয়েকটি পণ্য। সরকারের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ কার্যক্রম চলে ধান নিয়ে। এ কার্যক্রমে কৃষকের চেয়ে মিলাররাই সুবিধা পেয়ে থাকে বেশি। কৃষকের পণ্যের বিপণন সহজ করতে গড়ে তোলা হয়েছে বেশকিছু কৃষি মার্কেট। কিন্তু যথাযথ স্থান ও পরিবহন সুবিধার অভাবে সেগুলোর অধিকাংশই কাজে আসছে না। আবার ফসলের দামের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।
বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন ও বিপণন নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয় কৃষককে। আবার পাট ও তেলবীজের ক্ষেত্রেও কৃষকের প্রধান দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় বিপণন প্রতিবন্ধকতা। উৎপাদন নিয়ে প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয় সবজি, পাট ও ডালশস্য আবাদ করতে গেলে। ধান, পাট, তেলবীজ, ডালশস্য ও সবজি জাতীয় ফসল বিপণন করতে গিয়ে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষককে নানা ধরনের কঠিন প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয় বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক সাম্প্রতিক জরিপভিত্তিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনেই উঠে আসে, শস্য উৎপাদন এবং এর মুনাফা নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান দেশের কৃষকদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের চিড় ধরিয়েছে। বর্তমানে দেশের ৭৪ শতাংশ কৃষকই তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভুগছেন।
দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। ভূমিহীন, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষী এবং নারী কৃষকরাই দেশের কৃষি খাতের প্রধান অবলম্বন। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন করছেন ছোট কৃষকরা। যদিও সরকারি অর্থায়ন কার্যক্রমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তাদের প্রবেশাধিকার কম। এছাড়া সঠিকভাবে সংগঠন ও প্রশিক্ষণ পেলেও কৃষক তার ভাগ্য পরিবর্তনে এগিয়ে যেতে পারেন বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, কৃষককে সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করে সঠিক আবাদ পদ্ধতি জানানো গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ ও আবাদের সময়ও কমে আসে। একই সঙ্গে আর্থসামাজিক বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হয় কৃষকের।
যদিও এসব সেবায় প্রান্তিক কৃষকের যথোপযুক্ত প্রবেশাধিকার এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের গ্রামাঞ্চলে নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বেশি দেখা যায় প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে। অনেক পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ও সন্তানের প্রয়োজনীয় শিক্ষায় ব্যয় করার মতো সামর্থ্য নেই। কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য কনসালটেটিভ গ্রুপ টু অ্যাসিস্ট দ্য পুওরের (সিজিএপি) এক জরিপে উঠে এসেছিল, দেশের প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর ৬৬ শতাংশেরই কৃষির বাইরে আর কোনো আয় নেই। এর মধ্যে আবার ২৭ শতাংশ পরিবারেরই ইচ্ছা থাকলেও সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে জীবনযাত্রা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সন্তানের জীবনমান উন্নয়নের ব্যয়, বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের সামর্থ্যের অভাবে প্রান্তিক কৃষকের সন্তান শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক কৃষকই থেকে যাচ্ছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য ড. এমএ সাত্তার মণ্ডল মনে করছেন, গ্রামীণ জীবনযাত্রার উন্নয়নে ব্যয় বাড়ালে কৃষকেরও জীবনমান বাড়বে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কৃষি হলো গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সবার জন্য যদি বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও ভালো শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কৃষকের জীবনমানেরও উন্নয়ন হবে।
বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলক বেশি খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তানের কৃষকরা। যদিও সবুজ বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত কৃষকদের কাঁধে ভর করেই উৎপাদন বেড়েছে দেশটির। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালেও পাকিস্তানে দেশটির প্রধান খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন হয়েছিল ৪৬ লাখ টন। ১৯৭০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ লাখ টনে। সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে ২০০০ সালে তা দাঁড়ায় ২ কোটি ১০ লাখ টনে। পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (পিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটিতে প্রধান তিন খাদ্যশস্য গম, ভুট্টা ও চালের উৎপাদন প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ টন। এর মধ্যে গমের সম্ভাব্য উৎপাদন ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৪ হাজার টন। ভুট্টার উৎপাদন প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৮৯ লাখ ৪০ হাজার টন। এছাড়া চালের উৎপাদন হতে পারে ৮৪ লাখ ১৯ হাজার টন।
গত কয়েক দশকে পাকিস্তানে ব্যাপক মাত্রায় শিল্পায়ন হলেও এখনো দেশটির অর্থনীতির বড় স্তম্ভ হলো কৃষি। দেশটির মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৯ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির ৪২ শতাংশেরও বেশি কৃষিতে যুক্ত রয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় একটি উৎস হলো কৃষিপণ্য রফতানি। এছাড়া অন্যান্য অনেক খাতের প্রবৃদ্ধিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে এ কৃষি খাতের মূল চালিকাশক্তি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সেখানেও বিপণন ব্যবস্থার বহুস্তরে মধ্যস্বত্বভোগীরাই আত্মসাৎ করছে কৃষকের প্রাপ্য মুনাফা। এছাড়া দেশটির সার উৎপাদন খাতও এখন পুরোপুরি বেসরকারি। এসব কোম্পানি সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেলেও তাতে কৃষকের লাভ হয় খুব সামান্যই। এসব কোম্পানি এখন চাইছে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা থেকে বেরিয়ে আসতে। এতে করে সামনের দিনগুলোয় দেশটির কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা। এর মধ্যেও কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
দেশটিতে এখনো কৃষকের জন্য ভূমির ন্যায্য মালিকানা নিশ্চিত করা যায়নি। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেবার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিজমির মালিকানা আটকে রয়েছে কৃষিভিত্তিক খানাগুলোর মাত্র ৫ শতাংশের হাতে। সে হিসেবে দেশটিতে কৃষি খাতে দেয়া যাবতীয় ভর্তুকি ও প্রণোদনার প্রকৃত সুবিধাভোগীও তারাই।
কোনো কোনো বৃহৎ সামন্ত পরিবারের মালিকানায় কয়েক হাজার একর কৃষিজমি রয়েছে। যদিও এসব পরিবারের কৃষিতে কোনো অবদান নেই বললেই চলে। মূলত প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষকরাই এসব জমিতে কৃষিকাজ করে থাকেন। আবার সামন্ত পরিবারগুলোর বেড়াজাল থেকে এসব কৃষকের বেরিয়ে আসার সামর্থ্যও নেই।
কৃষিতে প্রয়োজনীয় সেচ, সার, ট্রাক্টর পারমিট ও ঋণ বণ্টনের ওপরও এ ভূস্বামীদেরই নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া। আবার রাজনীতিবিদ বা আইনপ্রণেতাদের পক্ষেও এ পরিস্থিতিতে বদল আনা সম্ভব নয়। দেশটির প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলে এ ভূস্বামীদেরই আধিপত্য বেশি। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে কৃষি খাতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সংস্কার আনা যায়নি। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার এ নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও এর প্রকৃত সুবিধাভোগী হয়েছে ভূমিমালিক সামন্ত পরিবারগুলোই।
পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ ড. আবিদ আমান বুরকির এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয়া হলেও এর সুবিধাভোগী মূলত মধ্যবিত্ত ও ধনী কৃষি মালিকরাই। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণে প্রবেশাধিকার ও নিজেদের বাড়তি আয়কে কাজে লাগিয়ে সহজেই স্বল্পসুদে ঋণসহ নানা অর্থায়নের সুবিধা পেয়ে থাকেন তারা। অন্যদিকে ক্ষুদ্র কৃষকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। তাদের জন্য অর্থায়নের সুবিধা একেবারেই কম। কোনোভাবে ঋণ পেতে সমর্থ হলেও এর জন্য উচ্চহারে সুদ পরিশোধ করতে হয় তাদের। এতে করে বাজারমূল্য যা-ই হোক, মাঝারি ও বড় কৃষকদের পক্ষে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়াটা অনেকটাই সহজ হয়। কিন্তু ভর্তুকির যথাযথ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ক্ষতি পোষানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্চহারে সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রাও অনেকখানি বেড়ে যায়।