কুষ্ঠ একটি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক ব্যাধি। দেশের ১১টি জেলায় এখনো এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়ে গেছে। চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের হার সবচেয়ে বেশি। মৌলভীবাজারে শনাক্ত কুষ্ঠ রোগীদের ৮৩ শতাংশই চা জনগোষ্ঠীর সদস্য বলে সরকারের তথ্যে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা শ্রমিকরা এ রোগের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। মূলত বসবাসের স্থান, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনাচারের কারণে রোগটির প্রাদুর্ভাব তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
জেলা সদরের মৌলভী চা বাগানের শ্রমিক বিনয় চাষার পায়ের ত্বকে ক্ষত দেখা দেয় দেড় বছর আগে। ক্ষত একসময় বাড়তে থাকলে নিজ উদ্যোগে ওষুধ সেবন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ক্ষত না শুকালে তিনি চা বাগানের নার্সের পরামর্শ নেন। বেসরকারি সংস্থা হিড বাংলাদেশের চিকিৎসক ক্ষতটিকে কুষ্ঠ রোগ বলে শনাক্ত করেন। নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার কারণে পঞ্চাশোর্ধ্ব বিনয় এখন অনেকটা সুস্থ। তবে তার স্ত্রীও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
শুধু বিনয় চাষাই নন, এমন রোগী মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোয় অনেক পাওয়া যাচ্ছে বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। তারা বলছে, কুষ্ঠ রোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতে শুরুতে আক্রান্তরা চিকিৎসকের কাছে আসতে চান না। একই সঙ্গে অসচেতনতা ও রোগের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। কুষ্ঠ রোগীদের সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়ার শঙ্কাও থাকে। ফলে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা প্রায় কঠিন।
সরকারের তথ্য বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত কুষ্ঠ রোগী চা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরাও। কুষ্ঠ রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ১১টি জেলা। এগুলো হলো মৌলভীবাজার, জামালপুর, বান্দরবান, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও মেহেরপুর। এসব জেলায় প্রতি লাখে পাঁচজন বা তারও বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
কুষ্ঠ প্রাচীন রোগগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, রোগটি প্রধানত ত্বক ও পেরিফেরাল স্নায়ুকে প্রভাবিত করে। চিকিৎসা না করা হলে স্থায়ীভাবে শারীরিক অক্ষমতার কারণ হতে পারে। কুষ্ঠ একটি অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ। বিশ্বের ১২০টি দেশে প্রতি বছর দুই লাখের মানুষের কুষ্ঠ রোগ শনাক্ত হয়। কোনো দেশের প্রতি ১০ হাজারের মধ্যে একজনের কম কুষ্ঠ রোগী যদি থাকে তাহলে সে দেশকে ‘কুষ্ঠমুক্ত’ ঘোষণা করা যেতে পারে। সেই হিসেবে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশকে কুষ্ঠমুক্ত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এখনো প্রতি বছর অনেক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও লেপ্রা বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে জেলায় ৭৬১ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়েছে। যাদের মধ্যে চা বাগানের শ্রমিক ৬৩১ জন। শতকরা হিসাবে এ হার প্রায় ৮৩ শতাংশ। গত বছরে কুষ্ঠ রোগ শনাক্ত হওয়া ২৫৭ জনের মধ্যে চা শ্রমিক ১৮৩ জন। রয়েছে ১৫টি শিশুও। ওই বছর দুজনের মৃত্যুও হয়েছে। ২০২২ সালে জেলায় শনাক্ত ১৮৯ জন কুষ্ঠ রোগীর মধ্যে ১৫৪, ২০২১ সালে ২৪৫ জনের মধ্যে ২৩১ ও ২০২০ সালে শনাক্ত হওয়া ৭০ জনের মধ্যে চা বাগানের শ্রমিক ছিলেন ৬৩ জন। বর্তমানে এ রোগে ২১৫ জন চিকিৎসাধীন। যাদের মধ্যে ১১টি শিশু রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বছর সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালে ২ হাজার ৯৫৯ জন কুষ্ঠ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। সে বছর সিলেটে নতুন ১৮০ জন, হবিগঞ্জে ১১৭, সুনামগঞ্জে ১০৩ ও মৌলভীবাজারে ২৫৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজারে শনাক্তের হার বেশি হওয়ায় জেলাটিকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে।
কুষ্ঠ রোগ নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লেপ্রা বাংলাদেশ। সংস্থাটির মৌলভীবাজারের আঞ্চলিক পরিদর্শক মো. জিয়াউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চা বাগানে কুষ্ঠ রোগের সংক্রমণ বেশি। চা শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। বিনামূল্যে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। আমরা চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় গুরুত্ব দিচ্ছি। রোগ নির্ণয়ের হার বেশি হওয়ায় রোগীও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চা বাগানে কুষ্ঠ রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ কারণে শনাক্তের হার বেড়েছে। সরকার তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে। শরীরের কোনো অংশে হালকা ফ্যাকাশে বা সাদা দাগ, ত্বকে পলিপ, ত্বকে বোধশক্তি হ্রাস এগুলো কুষ্ঠ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। কুষ্ঠ বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এটি সংক্রামক রোগ হলেও বংশগত নয়। রোগী চিকিৎসার আওতায় এলে জীবাণু ছড়ায় না। চিকিৎসায় বিলম্ব হলে হাত, পা ও চোখ বিকৃত হয়।’