সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ল প্রায় ৮৩%

ভর্তুকি না বাড়লে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ার শঙ্কা

দেশের সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটারে ১৩ টাকা ২৫ পয়সা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে সার কারখানার গ্যাসের দাম ঘনমিটারে ১৬ থেকে বেড়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা হয়েছে।

দেশের সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটারে ১৩ টাকা ২৫ পয়সা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে সার কারখানার গ্যাসের দাম ঘনমিটারে ১৬ থেকে বেড়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা হয়েছে। এর মাধ্যমে সার কারখানার গ্যাসের দাম ৮২ দশমিক ৮১ শতাংশ বাড়ানো হলো। গ্যাসের এ মূল্যবৃদ্ধি সারের দামে চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিসংশ্লিষ্টরা। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদনে। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, সার কারখানার গ্যাসের দাম বাড়লেও কৃষক পর্যায়ে সারের দাম বাড়বে না।

কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের সার কারখানাগুলোয় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে হয় সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে নতুবা সারের দাম বাড়বে। কিন্তু সারের বাড়তি দাম সামাল দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখন দেশের কৃষি খাতে নেই। সারের দাম বাড়লে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়বেন কৃষক, যার বড় প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে।

দেশে সারের চাহিদার মোট ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ স্থানীয় কারখানায় উৎপাদন হয়। দেশে উৎপাদিত সারের দাম বেশি হওয়ার কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। এখন কারখানাগুলোতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সার কারখানার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে মোট কৃষি উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ সারের পেছনে হয়। উৎপাদন খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবে সারের পেছনে ব্যয়ও বেড়ে যায়। যদি সার উৎপাদনে ব্যয় বাড়ে, তাহলে কৃষকের মোট উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসল ও কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে চালের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রভাব ফেলবে।’

সরকার যদি সারে ভর্তুকি না বাড়ায়, তাহলে দাম বাড়বে। সেক্ষেত্রে কৃষক সার ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন বলে মনে করেন এ কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাধারণত সারসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লে কৃষক কৃষি উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হন, যা মোট কৃষি উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় যদি কৃষক পর্যায়ে সারের দাম না বাড়ায় এবং ভর্তুকি বাড়িয়ে দেয় তাহলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও কৃষকের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ বর্তমান অবস্থায় সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে সারের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে পারে।

দেশে সার কারখানার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিতে এলএনজি আমদানির কথা। বছরের বেশির ভাগ সময় কারখানাগুলো গ্যাস না পাওয়ায় সার আমদানি করতে হয়। এখন সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়িয়ে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হবে। যার মাধ্যমে কারখানাগুলোয় গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেয়ার কথা বলেছে পেট্রোবাংলা ও বিতরণ কোম্পানিগুলো।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কমকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে সার কারখানাগুলোয় গ্যাসের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি স্থানীয় গ্যাস দিয়ে এ মুহূর্তে পূরণ করা সম্ভব নয়। এলএনজি আমদানি করে সার কারখানায় গ্যাস দিতে হবে। কিন্তু উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানি করে কম দামে সরবরাহ করলে পেট্রোবাংলা আর্থিকভাবে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কারখানা চালু রাখতে দাম বাড়িয়ে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি ইতিবাচক সাড়া দেয়। সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিইআরসিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিই। বাড়তি টাকা দিয়ে আরো বেশি এলএনজি আমদানি করে সার উৎপাদনে দেয়া হবে। তাতে গ্যাসের অভাবে বন্ধ চারটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে।’

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সব সার কারখানা (বেসরকারিসহ ছয়টি) পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখতে দৈনিক ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন, যেখানে কারখানাগুলো বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে ১৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে সার কারখানাগুলো বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গ্যাস পাচ্ছে। তবে গ্রীষ্ম ও তীব্র বিদ্যুৎ চাহিদার মৌসুমে এসব সার কারখানার অধিকাংশই গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকে।

জানা গেছে, দেশের সার কারখানায় বিভিন্ন সময় দাম বাড়ানো হলেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি পেট্রোবাংলা। এ কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় উৎপাদনে না থাকায় কারখানাগুলো লোকসানে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও শিল্প মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসেনি। বরং সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানোয় সার উৎপাদনে ব্যয় বেশি দেখিয়ে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল বিগত সরকারের আমলে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সার কারখানায় সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে তিন দফায়। সে বছর জুলাইয়ে সারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৭১ থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়। এরপর ২০২২ সালের জুনে আবারো গ্যাসের দাম ২৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সে সময় ঘনমিটারপ্রতি ১১ টাকা ৫৫ পয়সা বাড়িয়ে সারে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৬ টাকা। বর্তমানে তা আরেক দফা বাড়িয়ে এখন ২৯ টাকা ২৫ পয়সা করেছে বিইআরসি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সারের মোট চাহিদা প্রায় ৬৯ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। দেশে ব্যবহৃত সারের মধ্যে প্রধান হচ্ছে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) আহমেদ ফয়সল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিইআরসি গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে গণশুনানি করেছে। তারা সব স্টেকহোল্ডারের পাশাপাশি আমাদের সঙ্গেও আলাপ করেছে। আমরা অর্থ বিভাগকে বলেছি বিইআরসি দাম বাড়াতে চায়, আপনারা সেই অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করুন।’

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে সারের দামে কোনো প্রভাব পড়বে না জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়লেও কৃষকের ব্যয় বাড়বে না। কারণ সরকার সারের মূল্য এক পয়সাও বাড়াবে না। এখানে সরকার ভর্তুকি দেবে। কৃষকের ব্যয় বাড়বে না।’

সারে গ্যাস সংকটের কারণে বিসিআইসির কারখানাগুলো এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদনে ছিল না। বিসিআইসির ইউরিয়ায় এতদিন সরকার কেজিতে ১৩ টাকা ভর্তুকি দিত। বিপরীতে আমদানি করা ইউরিয়ায় ভর্তুকি ছিল ৩০ টাকার ওপরে। গ্যাসের দাম বাড়িয়েও যদি পর্যাপ্ত সার উৎপাদন করা যায় তাহলে আমদানীকৃত সারের চেয়ে স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় কম হবে বলে জানিয়েছেন বিসিআইসির কর্মকর্তারা।

গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক সংবাদ সম্মেলনে সার কারখানার গ্যাসের নতুন দরের ঘোষণা দেয়। আগামী ডিসেম্বর থেকে এ দর সমন্বয় হবে।

এর আগে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পেট্রোবাংলার বিতরণ কোম্পানিগুলো। গ্যাসের এ মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে গণশুনানি চলাকালে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতা করা হয়।

আরও