হারিয়ে যাওয়া নদের সন্ধান

উত্তরার খিদির খাল তালিকাভুক্ত হচ্ছে কনাই নদ হিসেবে

খিদির খাল প্রবাহিত হচ্ছে রাজধানীর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের মধ্য দিয়ে। আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশকিছু আবাসন প্রকল্প, সড়ক ও স্থাপনা।

খিদির খাল প্রবাহিত হচ্ছে রাজধানীর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের মধ্য দিয়ে। আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশকিছু আবাসন প্রকল্প, সড়ক ও স্থাপনা। সম্প্রতি খালটিকে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া কনাই নদের মূল প্রবাহের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। হারানো নদটিকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এজন্য আশপাশের আবাসন প্রকল্প, বাড়িঘর ও স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কনাই নদের উৎসমুখ ছিল টঙ্গী খাল নদীতে। সেখান থেকে কনাই নামে উত্তরার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তা পড়ত তুরাগে। স্বাধীনতার পরও রাজধানীর ভেতর দিয়ে কনাই নদ প্রবাহিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রভাবে রাজধানীর বুক থেকে দ্রুত হারিয়ে যায় নদটি।

বর্তমানে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদীটিকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ উদ্যোগ সফল হলে রাজধানীতে নদীর সংখ্যা বাড়বে আরো একটি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নদ পুনরুদ্ধারের কাজটি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাপাউবোকে।

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৮৮৮-১৯৪০ সালের ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভেতে তৈরি করা মানচিত্রে (সিএস ম্যাপ) কনাই নদের দৈর্ঘ্য দেখানো আছে ১২ দশমিক ২৮ কিলোমিটার। এর আগে রেনেলের মানচিত্রে (১৭৬৫ সাল) কনাই নদের দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার। বর্তমান দ্বিগুণ খাল ও দিয়াবাড়ী খাল এক সময় ছিল কনাই নদের অংশ। দখলে-দূষণে এ খাল দুটিও এখন বিপর্যস্ত। বর্তমানে নানা খালে বিভক্ত হয়ে কনাই নদের দৈর্ঘ্য কমেছে সিএস ম্যাপে পাওয়া দৈর্ঘ্যের তুলনায় ১ দশমিক ১০ কিলোমিটার। নামে বা বৈশিষ্ট্যে কোনোভাবেই এটি আর নদ নেই। বর্তমানে সরকারি কোনো নথিতেও ঢাকার নদ হিসেবে কনাইয়ের নাম পাওয়া যায় না।

জানা গেছে, বাপাউবোর তালিকায় কনাইকে এখন খিদির খাল হিসেবে তালিকাভুক্ত করা আছে। তবে সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের নদ-নদীর তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য একটি কমিটি করা হয়। কমিটি ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নদ-নদী খুঁজতে গিয়ে খিদির খালকে কনাই নদের মূল প্রবাহের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। বর্তমানে সিএস ম্যাপের সঙ্গে সংগতি রেখে এটিকে কনাই নদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কথা ভাবছে বাপাউবো ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত তালিকায় কনাই নথিভুক্ত হলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, দেবদোলাই ও নড়াইয়ের সঙ্গে ঢাকার সপ্তম নদী হিসেবে যোগ হবে কনাইয়ের নাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাপাউবোর ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী এমএল সৈকত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমরা প্রাথমিকভাবে খিদির খালটিকে কনাই নদ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। তবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার জন্য আমরা সিএস ম্যাপ পর্যালোচনা করছি। আগামী রোববার বা সোমবার আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারব। সিএস ম্যাপে যা আছে, সেভাবেই আমরা এটিকে নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ার দিকে এগোব।’

বর্তমানে খালটি ডিএনসিসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। খালটি নদ হিসেবে নথিভুক্ত করতে ডিএনসিসি পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখন সময় এসেছে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো পুনরুদ্ধার করার। কনাই নদ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আমরা তা প্রমাণ করতে চাই। সম্প্রতি পরিবেশ উপদেষ্টা নদটি সরজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। আমরা আশা করছি, দ্রুতই নদটি নগরবাসীকে উপহার দিতে পারব।’

রাজধানীর বুক থেকে কনাই নদ হারিয়ে যেতে সময় নিয়েছে মাত্র চার দশক। এজন্য প্রধানত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আবাসন প্রকল্প‌গুলোকে দায়ী করছেন গবেষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, স্বাধীনতার পর দ্রুত চিত্র পরিবর্তন হতে থাকে ঢাকার। আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বাণিজ্য-শিক্ষা ও চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে ওঠে ঢাকা। দ্রুততম সময়ে নগরীর এমন রূপান্তরের পুরোটাই হয়েছে অপরিকল্পিত। কোথাও নদী ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসন। আবার কোথাও বক্স-কালভার্টে বিলীন হয়েছে খাল ও জলাশয়। সে ধারাবাহিকতায় কনাই নদ সরু হয়ে পরিণত হয়েছে খিদির খাল হিসেবে। এখন এটিকে অনেকে রাজউক লেক বলেও উল্লেখ করে থাকেন।

কনাই নদ বিলীন হওয়ার পেছনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) বিভিন্ন সরকারি সংস্থার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এত দ্রুত নগরীর বুক থেকে একটি নদী হত্যা করে সেটাকে খাল হিসেবে দেখানো অবশ্যই অপরাধ। এর সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া হোক। দেরিতে হলেও সরকার নদটি নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু নথিভুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, একটি নদীর যে বৈশিষ্ট্য তা পূর্ণরূপে ফিরিয়ে আনতে হবে। টঙ্গী খাল থেকে উত্তরা হয়ে পল্লবী দিয়ে তুরাগ নদে সংযুক্ত হওয়ার কথা কনাইয়ের। এখানে নৌপথ সৃষ্টির পাশাপাশি দূষণমুক্ত স্বচ্ছ পানি ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাস তৈরি করার দাবি জানাচ্ছি।’

উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে সরজমিনে দেখা যায়, খিদির খালের আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। পরিষ্কার শেষে খালের দুই পাড়ে বৃক্ষ রোপণ করার পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। খালটিতে বর্তমানে কোনো দখল না থাকলেও খালপাড়ে আবাসন প্রকল্প ও ঘরবাড়ি দেখা গেছে।

খিদির খালের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান, এটি শুরু হয়েছে টঙ্গী খাল থেকে। তারপর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের সেতু হয়ে রূপায়ণ সিটির সামনে দিয়ে পল্লবী হয়ে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে।

ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নদী নিয়ে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) একটি গবেষণা করেছিল কয়েক বছর আগে। বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, স্বাধীনতার পরও রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ১৫টি নদ-নদী প্রবাহিত ছিল।

এ বিষয়ে গবেষণা দলের এক সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় মোট কতগুলো নদী ও খাল রয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে আমরা একটি জরিপ করি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বেশির ভাগ সরকারি সংস্থার কাছেও নদী ও খালের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। একসময় নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঢাকার নগরসভ্যতা এখন অস্তিত্ব সংকটে। গত চার দশকে এ শহরের বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া নদ-নদীর মধ্যে কনাই অন্যতম। নদগুলোর বিলুপ্তির পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও রাজউকের উদ্যোগে গড়ে তোলা আবাসনগুলো দায়ী বলে মনে করি। এছাড়া উত্তরা, বনানী, বনশ্রী, নিকুঞ্জসহ বড় বড় প্রজেক্ট তৈরির সময় কোনো পরিকল্পনা না থাকাও এর কারণ।’

কনাই নদ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ঢাকার জন্য একটি বড় উদাহরণ তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেছেন রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌আমরা এটিকে খিদির খাল হিসেবেই জেনে আসছি। তবে এটিকে যদি কনাই নদ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয় আর পূর্ণ নদীর বৈশিষ্ট্যসহ পুনরুদ্ধার করা হয় তাহলে রাজধানীর জন্য এটা হবে চমৎকার উদাহরণ। আমরা সড়কপথের উন্নয়ন করতে গিয়ে নৌ যোগাযোগ নষ্ট করে ফেলেছি। ফলে জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গু আমাদের সঙ্গী হয়ে গেছে। তাই কনাইসহ ঢাকার যত ওয়াটার বডি আছে, সবগুলো পুনরুদ্ধার করে শহরটির বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার এখনই উপযুক্ত সময়।’

আরও