বানারীপাড়ায় নদীর বুকে দুই শতকের ঐতিহ্য

একপশলা বৃষ্টি থামতেই আবার ঘনিয়ে এল মেঘ। নতুন রূপে সন্ধ্যা নদীর তীর। বর্ষার আকাশে সূর্যের দেখা নেই।

মৃদু ঢেউ এসে ভেঙে যাচ্ছে= তীরে। এর মাঝেই সন্ধ্যার বুক চিরে ভেসে আসছে ছইবিহীন ছোট ছোট নৌকা। প্রতিটি নৌকার খোলে সাজানো গোলাভর্তি চাল। কোনো নৌকায় সাদামাটা ইঞ্জিন, কোনোটিতে নিছক বৈঠাই ভরসা। কেউ এসেছেন গলুইভর্তি চাল নিয়ে; কেউ ফিরছেন গলুই ভরে। মায়াবী সন্ধ্যার জলে ঢেউয়ে দুলতে দুলতে হয়ে ওঠে এক অভাবনীয় দৃশ্য। একেকটি নৌকাই যেন ভাসমান দোকান আর তার ভেতরে শতাব্দীর ঐতিহ্য। ক্রেতারা আসেন, দর-কষাকষি করেন। কেউবা আবার চালের বোঝা পাইকারি নৌকায় তুলে দেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এ হাট। শনি ও মঙ্গলবার সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা নদী জেগে ওঠে এক বিশেষ উৎসবে। স্থানীয় লোকজন এ হাটকে ‘ভাসান মহল’ বলে ডাকেন।

চালের হাট বসে নদীর এক পাড়ে। ঠিক বিপরীত পাড়ে বসে ধানের হাট। কুটিয়ালরা এখান থেকে ধান কেনেন, নিয়ে যান চাতালে। কয়েক দিনের মধ্যে সেই ধান রূপ নেয় চালের সোনালি দানায়। ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে চালের হাট। এরপর জমে ওঠে ধানের হাট। ধানের মৌসুমে হাটের রঙ আরো গাঢ় হয়। তখন রবি ও বুধবার অতিরিক্ত হাট বসে, যাকে স্থানীয় লোকজন বলেন ‘গালা’।

ভাসমান ধান-চালের হাটের জন্মকথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। বয়োজ্যেষ্ঠদের ধারণা, অন্তত ২০০ বছর ধরে হাটটি টিকে আছে। সময়ের পালাবদলে ভাটা পড়েছে ঐতিহ্যে। তবু নদীর বুকে ভেসে চলা নৌকাগুলোই বলে দেয়—অর্থনীতির এ নদীকেন্দ্রিক ধারা এখনো নিভে যায়নি। বরং নিষ্প্রভ অবস্থায় টিকে আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি মানুষকে সড়কনির্ভর করেছে। অটো রাইস মিলে চাল উৎপাদন হওয়ায় কুটিয়ালদের সংখ্যাও কমেছে। এতে ভাসমান হাটও তার পুরনো রূপ হারাতে বসেছে। তবে এখনো যারা হাটে আসেন, তারা ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়েই আসেন।

হাটের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো সব লেনদেন হয় নগদে। বাকির কোনো প্রথা নেই। এজন্য হাটটি ‘নগদের হাট’ নামে পরিচিত। কৃষক বা কুটিয়ালরা নগদ টাকায় ধান-চাল বিক্রি করেন। দেশের অন্য বাজারগুলোয় যেখানে পণ্য বিক্রি করতে গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের চোরা ফাঁদে প্রান্তিক কৃষকদের টাকা গুনতে হয়, আছে খাজনার বাজনা। কিন্তু এ হাট পুরোপুরি ব্যতিক্রম। ২০০ বছরের বেশি বয়স হলেও এ হাটে কোনো আড়তদার নেই। নেই খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা। মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো দৌরাত্ম্যও তৈরি হয়নি। বিক্রেতারা নৌযানে করে পণ্য নিয়ে এসে হাটের সীমানায় নোঙর করেন। ক্রেতা এসে পছন্দমতো পরখ করে প্রয়োজনীয় ধান-চাল নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যান। নৌকায় বসেই পরিমাপ করে ক্রেতার নৌকায় পণ্য তুলে দেয়া হয়। স্বতঃস্ফূর্ত এ লেনদেনই ভাসমান হাটের প্রাণ।

আবদুল হাই নামের একজন পাইকারি ব্যবসায়ী মনে করিয়ে দেন পুরনো দিনের কথা। বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, গলাচিপা এমনকি সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীরাও এ হাটে আসতেন। ধান বিক্রি করে চাল কিনে নিজ এলাকায় ফিরতেন। সেই সোনালি দিনের ভিড় আজ আর দেখা যায় না।’

৩৫ বছর ধরে ভাসমান বাজারে চাল বিক্রি করা ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রথমে তিনি ধান কিনে বাড়িতে নিয়ে সেদ্ধ করেন। তিন-পাঁচদিন রোদে শুকিয়ে মিলে নিয়ে চাল বানিয়ে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন।’

সাবেক ইউপি সদস্য ও পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল হাই বলেন, ‘ভাসমান হাট ভালো শব্দে বললেও আমরা ভাসান মহল হিসেবে চিনি। পাকিস্তান আমল থেকে দেখে আসছি, এখানে বরগুনা, ভোলা, খেপুপাড়া, চরদুয়ানি, জ্ঞানপাড়া, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ব্যাপারীরা ধান নিয়ে আসতেন। ধান বিক্রি হলে চাল কিনে নিয়ে যেতেন যার যার এলাকায়। ভাসান মহল আমাদের আয়ের প্রধান উৎস। এখনো প্রতি হাটে এক-দেড় হাজার মণ বেচাকেনা হয়।’

গোপালগঞ্জ থেকে ধান নিয়ে আসা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, ‘শুধু গোপালগঞ্জ নয়, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধান কিনে এখানে এসে বিক্রি করি। আমরা সাধারণত বীজ বপনের পরপরই খেত কিনে রাখি। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছি।’

কুটিয়াল মো. কাওছার বলেন, ‘নদীপথে পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী এবং নির্ধারিত পণ্যের চেয়েও বেশি পরিমাণে নিয়ে গন্তব্যে যাওয়া যায়। ধরুন একটি গাড়িতে ২০ মণ ধান নেয়া যায়। কিন্তু ট্রলারে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। আমি আজ ১২৫ মণ ধান কিনেছি। এতে সড়কপথের চেয়ে খরচ ও পরিশ্রম কম।’

ধান-চালের হাটকে কেন্দ্র করে তীরে কয়েকটি দোকানও গড়ে উঠেছে। যেখানে রুটি, কলা, ডাব, পানি, পান, চা পাওয়া যায়। অনেকেই নৌকায় করে সবজি বিক্রি করতে আসেন। সবজি বিক্রেতা শামসুল হক বলেন, ‘এ হাটে সবজিও ভালো বিক্রি হয়। ভোর থেকে অনেক মানুষ থাকায় যার যে সবজি দরকার হয়, কিনে নিয়ে যায়। মৌসুম অনুসারে যে সবজি দরকার, তা বাজার থেকে কিনে এনে এখানে বিক্রি করি। নিজের খেতের সবজিও বিক্রি করি। ভাসান মহলের ওপর নির্ভর করেই আমার সংসার চলে।’

এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদুর রহমান বলেন, ‘ধান-চালের ভাসমান হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেনি; যুগ যুগ ধরে এর সুখ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ ও দেশের বাইরে। হাটটি যেহেতু নদীতে মেলে, এজন্য খাজনা মওকুফ করা হয়েছে। ফলে এ হাটে ব্যবসা করতে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই বেশ আগ্রহী। আমি মনে করি, নদী যতদিন থাকবে, নদীকেন্দ্রিক এমন বাজার এবং বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতিও টিকে থাকবে।’

আরও