তবে গত কয়েক বছর জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাইসহ বিভিন্ন কারণে সম্ভাবনাময় এ শিল্প চরম সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়-উপদ্রুত এসব এলাকায় ঘেরের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের চরম বিপর্যয় তৈরি হওয়ায় সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে চিংড়ি চাষ কমে আসে। এক সময় লবণের প্রভাব কাটিয়ে এ এলাকার জমিতে ফেরে সবুজ ফসল। এক ফসলি আমন ধানের জমিতে তরমুজ হয়ে ওঠে কৃষকের নতুন ভরসা। খুলনার তরমুজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। তরমুজ চাষে ঘুরে দাঁড়ায় উপকূলীয় জনপদের কৃষি অর্থনীতি।
চাষীরা বলছেন, উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের মাটি অতিরিক্ত লবণাক্ত। মিঠাপানির অভাবে বছরের অধিকাংশ সময় ফসলি জমি পড়ে থাকত। লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষের কারণে এক সময় শুধু বর্ষা মৌসুমেই আমন ধান উৎপাদন হতো। গত কয়েক বছর সেই জমিগুলোই স্বপ্ন দেখায় চাষীদের। কিন্তু উৎপাদনের ঝুঁকি, বাজারদরে অস্থিরতা, সেচ সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকায় তরমুজ চাষে এখন খুব একটা লাভ নেই। অনেকে ঝুঁকি এড়াতে চাষ কমিয়েছেন। কেউ কেউ একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন।
খুলনার তরমুজ সাধারণত এপ্রিলের শুরু থেকে বাজারে আসে। এর ২০-৩০ দিন আগে পটুয়াখালীর তরমুজ বাজারে আসায় ওই অঞ্চলের কৃষক ভালো দাম পান। এক সময় যে তরমুজ উপকূলের অর্থনীতিতে গতি এনেছিল, এখন তা অনেকের কাছে অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠছে। টানা কয়েক বছরের লোকসানে এবার অঞ্চলটিতে তরমুজ আবাদে বড় ধস নেমেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মৌসুমে খুলনায় ১৭ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছিল। উৎপাদিত তরমুজের বাজার দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৯৩০ হেক্টরে। অর্থাৎ ১ বছরে ৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর জমিতে চাষ কমেছে।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচই ওঠেনি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। খুলনায় তরমুজ কিছুটা দেরিতে ওঠে। পটুয়াখালীর চাষীরা আগে বাজার ধরেন। আমাদের তরমুজ বাজারে আসার সময় কখনো চাহিদা থাকে, কখনো থাকে না—এ অনিশ্চয়তায় কৃষক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’
খুলনায় সবচেয়ে বেশি তরমুজ চাষ হয় দাকোপে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘বাজুয়ার তরমুজ’ নামে পরিচিত এ সুমিষ্ট ফল। জেলার মোট উৎপাদনের ৫০-৫৫ শতাংশ আসে এ উপজেলা থেকে। এলাকাটির চার হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি তরমুজ চাষের সঙ্গে যুক্ত।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনার কৃষক আগে তরমুজ চাষে অভ্যস্ত ছিলেন না। ১৯৯৭ সালে সরকারের প্রণোদনায় দাকোপ উপজেলার বাজুয়া গ্রামের রবি কয়াল ও পঙ্কজ কয়াল প্রথম তরমুজ চাষ করেন। তাদের দেয়া হয় বিনামূল্যে বীজ ও সার। সেবার ভালো ফলন হওয়ায় তাদের দেখাদেখি আরো কৃষক তরমুজ চাষে আগ্রহী হন। ২০১৫ সালের পর থেকে দাকোপ উপজেলার সব ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় তরমুজ চাষ শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায়ও এর প্রসার ঘটে। গত বছর দাকোপে ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। তবে এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮০০ হেক্টরে।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ভালো ফলন হলেও অনেক কৃষক তরমুজ বিক্রি করতে পারেননি। ফসল তোলার সময় বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। রমজানকে সামনে রেখে অনেকেই তরমুজ চাষ করেন। এবার সেই বাজার ধরা যায়নি। তাই অনেকে ঝুঁকি নেননি।’
দাকোপের পর সবচেয়ে বেশি তরমুজ হয় কয়রা, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছায়। গত বছর কয়রায় ৪ হাজার ৫০ হেক্টর ও পাইকগাছায় ২ হাজার ১৪০ হেক্টরে আবাদ হয়েছিল। এবার তা কমে যথাক্রমে ২ হাজার ৬০০ ও ১ হাজার ৫০ হেক্টরে নেমেছে।