আপনাদের একটি প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়কে অর্থনীতির জন্য একটি সন্ধিক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে। আপনার মতে, গত দুই দশকের ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মডেলটি এখন আর কাজ করছে না কেন?
ধন্যবাদ। বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের শেষের দিকে। স্বাধীনতার পর আমরা সোশ্যালিস্ট অর্থনীতির দিকে গিয়েছিলাম, যা খুব একটা সুখকর ছিল না। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা ইকোনমিক রেগুলেশন (সরকারি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ) থেকে প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশনে (বিচক্ষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) গেলাম। এর মানে হলো বাজার ব্যবস্থার অংশীজনদের সুযোগ দেয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা ন্যাশনালাইজেশন থেকে প্রাইভেটাইজেশনের দিকে গেলাম। আর্থিক খাতে বেসরকারি ব্যাংক এল। আশির দশকের শুরু থেকে কৃষি ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ শুরু হলো। ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কন্ট্রোল ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা উদারীকরণের দিকে গেল। আমি একে বলি বাংলাদেশের গ্রোথ ফেজ ১.০। যেখানে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র পরিচালিত অর্থনীতি থেকে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
নব্বইয়ের দশকজুড়ে বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে একে আরো গভীর করা হলো। ট্রেড লিবারালাইজেশন ও ভ্যাট চালুর মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ করার ক্ষমতা বাড়ল। নব্বইয়ের দশকের শেষে আর্থিক খাতের সংস্কার বা ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর রিফর্ম প্রোগ্রাম’ (এফএসআরপি ১ ও ২)-এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের গ্রোথ মডেলটি পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর বাজারমুখী অর্থনীতিতে পরিণত হলো। এটি ছিল ফেজ ২.০। এরপর ২০০০-এর দশকের শুরুতে এল ফেজ ৩.০। তখন মোবাইল টেলিকম, ব্যাংকিং, এনবিএফআই ও ইন্স্যুরেন্স খাতের বিস্তার ঘটল। একই সময়ে ওষুধ, চামড়া, পাদুকা ও ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (এফএমসিজি) খাতের গোড়াপত্তন হলো। এর ভিত্তিতেই নব্বইয়ের দশক থেকে কভিড পর্যন্ত আমরা গড়ে ৫ শতাংশ হারে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। এ বাজারভিত্তিক বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক মডেলের মূল চালিকাশক্তি ছিল আশির দশকে শুরু হওয়া গার্মেন্টস এক্সপোর্ট। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মতো ভালো পলিসি আমাদের গ্লোবাল মার্কেটে সক্ষমতা তৈরি করেছে।
তবে এ মডেল আর এককভাবে ভার বইতে পারছে না। কারণ ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নতুন কোনো বৈচিত্র্য আসেনি। গার্মেন্টসের ভেতরেও বৈচিত্র্য থমকে গেছে। ২০১১-১২ সালে মোট রফতানিতে গার্মেন্টসের অবদান ছিল ৭৩-৭৪ শতাংশ, যা এখন ৮২-৮৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আবার এর ভেতরে মাত্র পাঁচটি পণ্যই প্রায় ৭৫ শতাংশ রফতানি দখল করে আছে। পৃথিবী যেখানে ৭০-৭৫ শতাংশ ম্যানমেড ফাইবার মডেলে চলে গেছে, আমরা এখনো উল্টোভাবে ৭০-৭৫ শতাংশ কটন মডেলে পড়ে আছি। আমাদের বাজারও মূলত ইউএসএ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউকে—এ তিন অঞ্চলের ওপর ৭৫ শতাংশ নির্ভরশীল। ফলে রফতানি বৃদ্ধির যে গতি থাকা উচিত ছিল, তা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কর্মসংস্থান। ২০১৪-১৫ সালের পর থেকে আরএমজি খাতের কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার নিম্নমুখী হয়েছে। অথচ আমাদের প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ লেবার বাজারে আসছে। আমরা বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের (জনমিতিক লভ্যাংশ) মধ্যে আছি—পপুলেশনের মিডিয়ান এজ ২৮ বছর এবং ৬৮ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। এ বিশাল জনশক্তির জন্য হাই-কোয়ালিটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে তা জনসম্পদের বদলে বোঝায় পরিণত হবে। গার্মেন্টসের বাইরে অন্য কোনো সেক্টর এখনো ২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারেনি। এমনকি অভ্যন্তরীণ বাজারেও মাত্র চার-পাঁচটি সেক্টর ৭১ শতাংশ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আধিক্যের কারণে গুণগতভাবে মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না।
একই অবস্থা কৃষিতেও। সত্তরের দশক থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা জনসংখ্যাকে খাওয়ানোর মতো জায়গায় এসেছি। জমি কমলেও এবং মানুষ বাড়লেও আমরা সবজি বা শস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং ও এগ্রিকালচার—উভয় খাতের প্রবৃদ্ধিই এখন একটি সীমায় এসে ঠেকেছে। তাই এ মডেল থেকে বের হতে হলে আমাদের ডাইভার্সিফায়েড ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় রূপান্তর করতে হবে। বৈচিত্র্যময় বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ওপরই আমাদের আগামী দিনের উন্নয়নের কাঠামো ও সাফল্য নিহিত।
আপনি ডোমেস্টিক ইকোনমির কথা বলছিলেন, যেখানে চাহিদা হ্রাসের একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ প্রবণতা কি দীর্ঘমেয়াদি কোনো মন্দার পূর্বাভাস দিচ্ছে?
কিছুদিনের মধ্যে নীতিকৌশলের মাধ্যমে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকিতে পড়ে যাব। আমরা অলরেডি প্রায় তিন বছর ধরে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ধীরগতি বা মন্দা ভাবের মধ্যে আছি। এর শুরু ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জে পড়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি ১৪ থেকে নেমে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি এলেও বাজারে এর প্রতিফলন নেই। এর বড় কারণ বিবিএসের ভিত্তি বছর। ভিত্তি বছর ২০২২ বা ২৩ ধরলে অফিশিয়াল ইনফ্লাশন এখনো ১৪ শতাংশই দেখাত। এ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। ২০২২ সাল থেকেই তারা জীবনযাত্রার মান বা ভোগের ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আশা করেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামবে, কিন্তু তা আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে না পারলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার মন্থর অবস্থা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। গত ১৮ মাসে সরকারি পরিসংখ্যান হালনাগাদ না হলেও বেসরকারি তথ্যমতে, দারিদ্র্যের হার ১৮ থেকে বেড়ে ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এছাড়া শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বেকারত্বের হার ৫ শতাংশের নিচে দেখালেও তা মিসলিডিং। প্রকৃত অর্থে বেকারত্বের সঙ্গে আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট এবং নিট (এনইইটি-নট ইন এমপ্লয়মেন্ট, এডুকেশন, ট্রেনিং) পপুলেশন—যারা শিক্ষা, কাজ বা ট্রেনিং কোনোটিতেই নেই—উভয়ই ঊর্ধ্বমুখী। একদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান না বাড়ায় আয় বাড়ছে না। ফলে গত ৪০ বছরের রফতানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কাঠামো বা মডেলকে কমপ্লিমেন্ট করার মতো অভ্যন্তরীণ ভোগ তৈরি হচ্ছে না। রেমিট্যান্সের বড় প্রবাহ থাকলেও ২০২২ সাল থেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা স্থবির হয়ে আছে।
দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকিটা তাহলে এখনো রয়ে গেছে?
আমরা বর্তমানে মন্দার মধ্যেই আছি। এখান থেকে বের হতে হলে সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ মন্দার মূল কারণ মূল্যস্ফীতি। নীতি সুদহার ১০ দশমিক ৫ শতাংশে থাকলেও এটি আর অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারছে না। বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সাপ্লাই-ড্রিভেন বা সরবরাহজনিত। ২০২২ সালে রিজার্ভ সংকটের কারণে আমদানি সংকোচনে যেতে হয়েছিল, যার ফলে এখনো আগের তুলনায় ১৮-১৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি কম হচ্ছে। আমরা যেহেতু মূলত আমদানিনির্ভর দেশ, তাই আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে, চাহিদা হ্রাসের আশঙ্কায় অনেক উৎপাদনকারীও প্রডাকশন কমিয়ে দিয়েছেন।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আমাদের স্বাভাবিক সরবরাহ পরিস্থিতিতে যেতেই হবে। টাকার ভ্যালু যাতে আর না কমে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ভোগ বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে এটি কেবল একটি লেয়ার। সামগ্রিক চাহিদা বাড়াতে আমাদের ভ্যাট অব্যাহতির মতো কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন ইউকে কভিড-পরবর্তী সময়ে রেস্টুরেন্ট বা সার্ভিস সেক্টরকে বুস্ট দিতে ভ্যাট ছাড় দিয়েছিল। এছাড়া সরকারি বিনিয়োগের একটি বড় ভূমিকা থাকে, যা ২০ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। রেভিনিউ বা লোন নেয়ার সুযোগ সীমিত হলেও সরকারি সম্পদের পুনর্বণ্টন ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে চাহিদাকে বেগবান করতে হবে। বিষয়টিকে শুধু মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি মন্দায় তলিয়ে যাব।
আমাদের অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এ মুহূর্তে ঋণখেলাপি। আপনারা প্রতিবেদনেও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন এবং কিছু সুপারিশ করেছেন। এ প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে জানতে চাই এবং এগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করেন?
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুই-তিনটা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা যদি করতে না পারি, তবে তা ইকোনমিক ক্র্যাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে। একটা হলো ফরেন এক্সচেঞ্জ ও ব্যালান্স অব পেমেন্ট, দ্বিতীয় হলো জ্বালানি আর তৃতীয় হলো ব্যাংকিংয়ের অবস্থা। কোনো কারণে একটা-দুইটা ব্যাংক কলাপস করে ব্যাংক রান হলে পুরো অর্থনীতি ধসে যেতে পারে। ৩৬ শতাংশ এনপিএল পৃথিবীতে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ। গত ১৮ মাসে তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন আনার প্রচেষ্টায় এটি ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। এছাড়া মন্দার কারণে ব্যবসায়িক ঝুঁকি অনিচ্ছাকৃত খেলাপিও যোগ হবে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় ৯০ দিনে নিয়ে এলে এটি আরো বাড়বে। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি মামলাধীন থাকায় সেগুলোকে খেলাপি ঋণ বলা যাচ্ছে না। ওগুলো যোগ করলে ডিফল্ট লোন ৫০ শতাংশ। একটি খাতের এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ এখন অচল সম্পদ (স্ট্যান্ডেড অ্যাসেট) হিসেবে আটকে আছে।
ব্যাংকিং সেক্টর থেকেই প্রবৃদ্ধি অর্থায়ন করা হয়; ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসেটসের প্রায় ৮৯ শতাংশ এখানে। যে খাতের অর্ধেক অ্যাসেট আটকানো, সেখানে ফাইন্যান্স কোত্থেকে আসবে? স্থিতিশীলতা এ মুহূর্তে ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার; অন্যথায় পুরো অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে। অসচ্ছল ব্যাংকগুলোকে বন্ধ করা ভালো স্টেপ ছিল, কিন্তু আবার সরকারি মালিকানায় নতুন ব্যাংক ক্রিয়েট করা ভুল হয়েছে। আরো কিছু ব্যাংকের অবস্থা খারাপ, তাদের কনসলিডেশনে নিয়ে আসতে হবে। এনবিএফআইয়ের মধ্যে অন্তত আরো আট-দশটা আছে যারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, তাদের দ্রুত বন্ধ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ডিপোজিটরদের জন্য মার্কেট বেজড ও সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিগত ১৮ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার বা ব্যাংক কোম্পানি অ্যাক্টের প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। অর্থঋণ আদালত আইন (মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট), যেটা খেলাপি ঋণকে অ্যাড্রেস করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা সংস্কারের উদ্যোগ শুনলেও দেখিনি। এ ৩৬ শতাংশ এনপিএল ব্যাংকের প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং ও পুঁজির পর্যাপ্ততা এবং বৈশ্বিক আস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এটি কমানোর বিশ্বব্যাপী উপায় হলো ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’। এর মাধ্যমে এনপিএলের বড় অংশকে কেনাবেচা ও রিস্ট্রাকচারিং করে রিকভার করা যায়। এ আইনের জন্য অধ্যাদেশ আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু আমরা সেগুলো এখনো করিনি।
পাবলিক ইনভেস্টমেন্টের কথা বলছিলেন। প্রতিবেদনে সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে একটা বার্ষিক সিলিংয়ের কথা আপনারা বলেছেন। সেটা কার্যকর হলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হতে পারে কিনা?
হতেই পারে, বাংলাদেশ একটা উভয়সংকটে পড়ে গেছে। সরকারি প্রকল্প ও ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্ডিচার রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন, কিন্তু সরকারের হাতে টাকা নেই। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি শ্লথ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০১৫-১৬ সাল থেকে এত দ্রুত ঋণ নেয়া হয়েছে, এত বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে যে পরিশোধের চাপ বেড়ে গেছে। সুতরাং যথেচ্ছ লোন নেয়া যাবে না। এর কোনো দ্রুত বা স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই।
রাজস্ব ক্ষেত্রে জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ কর ছাড় দেয়া আছে। নতুন সেক্টরকে উৎসাহ দিতে করছাড় লাগলেও যারা দশকের পর দশক ধরে সুবিধা পেয়ে হাইলি কম্পিটেটিভ ও প্রফিটেবল, তাদের আর প্রয়োজন নেই। এখানে করছাড় কমিয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু অতিরিক্ত টাকা পাওয়া সম্ভব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লাভজনক প্রচুর কোম্পানি আছে, সেখানে করযোগ্য অনেক উৎস আছে। এছাড়া কর আইনগুলোকে আরো করদাতা ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে।
ঋণের ক্ষেত্রে কঠিন শর্তের স্বল্পমেয়াদি ঋণগুলোর শর্ত নতুন করে নির্ধারণ (রিনেগোশিয়েট) করে মেয়াদ বাড়াতে হবে এবং সেগুলো সহজ শর্তের (কনসেশনাল) করতে হবে। নতুন ঋণ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এডিবির মতো মাল্টিল্যাটারাল দাতা সংস্থা থেকে নিতে হবে, যেখানে হাই-ইকোনমিক বা হিউম্যান ক্যাপিটাল রিটার্ন আছে। আগামী কয়েক বছর বড় অবকাঠামো প্রকল্প সরকারি টাকায় করা যাবে না। তবে বন্দর বা হসপিটালের মতো অবকাঠামোতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বা বেসরকারি বিনিয়োগ কাঠামো (মডেল) খতিয়ে দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, নতুন অর্থায়নের উৎস বাড়াতে হবে। বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বা বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সরকার বিশ্ববাজার থেকেও বন্ডের ভিত্তিতে টাকা সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া সরকারের যে সম্পদ বা রিয়েল অ্যাসেটস আছে—এয়ারপোর্ট, বন্দর, পাওয়ার প্লান্ট বা ব্রিজ—এগুলোর আর্নিংস আছে। পদ্মা বা যমুনা ব্রিজের মতো অ্যাসেট বাস্কেট করে লোকাল বা গ্লোবাল ক্যাপিটাল মার্কেটে ‘অ্যাসেট ব্যাকড সিকিউরিটাইজেশন’ লঞ্চ করা যায়। অনেক দেশ এসব অ্যাসেটের ২০ শতাংশ ইকুইটি মার্কেটে বিক্রি করে দেয়, যাতে লোন নেয়ার চাপ কমে। সরকারকে এ ধরনের উদ্ভাবনী অর্থায়ন পন্থায় যেতে হবে।
অর্থনীতির এ সংকটকালীন অবস্থায় আপনাদের এ প্রতিবেদন করার প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলুন।
এ প্রতিবেদনের উদ্যোগ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে নেয়। যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসছিল, আমরা দেখলাম যে বাংলাদেশ অনেক বছর পর একটি প্রোপার ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের দিকে যাচ্ছে। এ ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের সাফল্য নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিলেও যদি অর্থনৈতিক মন্দা থাকে, তবে এ ট্রানজিশন টেকসই হওয়া কঠিন। অর্থনীতি সাড়ে তিন বছর ধরেই মন্দার মধ্যে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ফায়ার ফাইটিং করে পতন কিছুটা ঠেকানো গেলেও অর্থনীতি শক্তিশালী হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু বেসরকারি খাতনির্ভর, তাই সেই খাতের সংকটগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। বিএনপি তাদের ম্যানিফেস্টোতে বিনিয়োগ, এফডিআই বৃদ্ধি এবং স্মল বিজনেসের কথা বলেছে। কিন্তু বর্তমান সমস্যাটি বহুমাত্রিক এবং একে সমন্বিতভাবে ট্যাকল না করলে সমাধান সম্ভব নয়। ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন শক্তিশালী করা এবং সংকটের বহুমাত্রিকতা সরকারের কাছে তুলে ধরতেই আমাদের এ উদ্যোগ।
আমরা প্রতিবেদনে সাতটি বড় এরিয়া আইডেন্টিফাই করেছি, যেখানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় গত ১৮ মাসে একটি ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা এলেও ইনফ্লাশন আবার বাড়ছে, এক্সপোর্ট পড়ছে এবং টাকার মান কমে যাচ্ছে। আমাদের নিট রিজার্ভ ১৯-২০ থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া ভালো লক্ষণ, কিন্তু ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে ৫-৬ শতাংশে যেতে যে আমদানি চাহিদা আসবে, তার জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো বহিঃসংকট সামলানোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। ম্যাক্রো স্থিতিশীল না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকবে না এবং প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো কাজ করবে না।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক ও দায় শৃঙ্খলার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কর রাজস্ব ৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং নতুন ঋণ নেয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। তাই রেভিনিউ বাড়ানো, উদ্ভাবনী উৎস থেকে অর্থায়ন এবং ঋণকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি।
তৃতীয়ত, গত দুই বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি তলানিতে পৌঁছেছে; এটি জিডিপির ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। এফডিআইয়ের অবস্থাও নগণ্য। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা বৈচিত্র্যায়ণ সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগ পরিবেশের সংস্কার ও প্রমোশন প্রয়োজন।
চতুর্থত, রফতানি সক্ষমতা ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। ট্রাম্প ট্যারিফ, ট্রেড প্রটেকশনিজম ও বৈশ্বিক রেগুলেশন মোকাবেলা করে রফতানির সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন আসছে। একটিমাত্র সেক্টরের ওপর ৮২ শতাংশ নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সেক্টরকে এমপ্লয়মেন্টের দায়িত্ব নিতে হবে। রফতানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈচিত্র্য আনা আমাদের অন্যতম সুপারিশ।
দক্ষতা ও কর্মসংস্থান খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রয়োজন। আগামী ১০-১৫ বছরের ইকোনমিক ভ্যালু চেইন মাথায় রেখে একটি ‘ন্যাশনাল স্কিলস স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করতে হবে, যা বর্তমানে নেই। দরিদ্র ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য স্কিলসের অ্যাকসেস নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া অর্থনীতির অন্যতম বা প্রাথমিক জোগানদাতা হিসেবে কাজ করে ব্যাংক খাত। যে ব্যাংকিং সেক্টরে ৩৬ শতাংশ অ্যাসেট স্ট্যান্ডেড, তার সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। ব্যাংক স্ট্যাবিলাইজেশনের পাশাপাশি ক্যাপিটাল মার্কেট ও বন্ড মার্কেটের মতো বিকল্প অর্থায়ন সোর্স তৈরি করতে হবে।
সর্বশেষ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা। আমরা এনার্জি সেক্টরে ভয়াবহ অবস্থায় আছি। ২০১১ সালের পর থেকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন প্রায় বন্ধ। বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অদক্ষতা ও ভর্তুকির বোঝা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে গ্যাসের বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অর্থনীতির পুনর্গঠন ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে এ সাতটি ক্ষেত্রে সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এখনই কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে।