সৌদিতে ছয় মাসে বাংলাদেশীসহ ৫৯ বিদেশীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ইএসওএইচআর বলছে, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি বা ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এমন অপরাধের জন্য, যেখানে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ ছিল না। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের সীমিত ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জন বিদেশী নাগরিক, যাদের মধ্যে বাংলাদেশীও রয়েছেন। ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে কতজন বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তা প্রতিবেদনে আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

ইএসওএইচআরের হিসাবে, এ সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিরা ১৭টি দেশের নাগরিক। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে। এ ধরনের অপরাধে ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যা মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৬৬ শতাংশ। হত্যার দায়ে ২৫ জন, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মামলায় নয়জন এবং অন্যান্য মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

ইএসওএইচআর বলছে, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি বা ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এমন অপরাধের জন্য, যেখানে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ ছিল না। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের সীমিত ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মোট মৃত্যুদণ্ডের ৮৪টি কার্যকর হয়েছে ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন দেয়া শাস্তির ভিত্তিতে। এটি মোট মৃত্যুদণ্ডের ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

ইএসওএইচআর আরো জানিয়েছে, ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির বিষয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা বা অন্য সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা পর্যবেক্ষণ বা নথিভুক্ত করতে পারেনি। এসব মামলা মোট সংখ্যার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ। সংস্থাটির মতে, এটি মৃত্যুদণ্ডের মামলায় তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৭১ জনের মধ্যে ৪৯ জন বিদেশী নাগরিক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিলেন ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিক। ইএসওএইচআর বলছে, এতে অভিবাসী শ্রমিক ও অন্যান্য বিদেশীর ওপর এ নীতির তুলনামূলক বেশি প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। মাদক-সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ হাশিশ-সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মামলায় বছরের প্রথম ছয় মাসে নয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন এর আগে তার আটককে স্বেচ্ছাচারী বলে মত দিয়েছিল। এছাড়া গত ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেয়ার অভিযোগও ছিল।

ইএসওএইচআর বলছে, বর্তমানে অন্তত পাঁচজন এমন ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত বলে অভিযোগ করা অপরাধের মামলা রয়েছে। তারা হলেন ইউসুফ আল-মানাসিফ, জাওয়াদ কুরেইরিস, হাসান জাকি আল-ফারাজ, মাহদি আল-মোহসেন ও আলী আল-মাবইউক।

এছাড়া মতপ্রকাশ-সংক্রান্ত বা রাজনৈতিক অভিযোগে আরো ৪৯ জন বন্দি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে শেখ সালমান আল-ওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকিও আছেন। ২০১৮ সাল থেকে তাদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আসছে সৌদি প্রসিকিউশন।

ইএসওএইচআরের তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছেন। খামিস মুশাইত কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের একটি ওয়ার্ডে ৫৮ জন ইথিওপীয় নাগরিক রয়েছেন। নাজরান কারাগারে আরো পাঁচ ইথিওপীয় ও পাঁচ সোমালি এবং তাবুক কারাগারে আট মিসরীয় নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সংস্থাটি এসব বন্দির মামলায় পেশাদার দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে।

প্রতিবেদনে ইএসওএইচআর বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নির্যাতনের অভিযোগ, বৈষম্য ও অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।

আরও