দেশে ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম সিলেট। বিশেষ করে সিলেট নগরী। প্রতিনিয়ত নগরে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। এসব ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সক্ষমতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না বিধিমালা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরীতে অন্তত ৪২ হাজার ভবন রয়েছে। এসবের বেশির ভাগই পুরনো ও দুর্বল। যেগুলো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত সাতটি ভূমিকম্প হয়েছে এ অঞ্চলে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি এড়াতে ২০১৯ সালে নগরীর ২৪টি ভবনকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ওই সময়ে চারটি ভবন অপসারণ করা হয়। দুটি ভবন বিশেষজ্ঞ পরামর্শে সংস্কার করা হলেও বাকিগুলো এখনো রয়ে গেছে আগের মতো।
নগর এলাকায় ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিমালা ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হয়। ইমারত বিধিমালায় ভবনের স্থাপত্য ও স্থাপত্য নকশার ওপর ভিত্তি করে অন্য সব নকশা অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি, ভবনের উচ্চতা, পার্কিং সুবিধা, খোলা জায়গার পরিমাণ ইত্যাদি মানদণ্ড নির্ধারণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ভূমিকম্প প্রতিরোধ ইত্যাদি পলিসিগত কাঠামো প্রস্তুত, সৌরশক্তি ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি পরিবেশগত নীতি প্রস্তুত, ভবনের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে নির্মাণ নিশ্চিত করা হয়।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এড়াতে ২০১৯ সালে নগরীর ২৪টি ভবনকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ওই সময়ে চারটি ভবন অপসারণ করা হয়। দুটি ভবন বিশেষজ্ঞ পরামর্শে সংস্কার করা হলেও বাকিগুলো এখনো রয়ে গেছে আগের মতো। রঙ দিয়ে পুরনো এসব ভবনকে সাজানো হয়েছে নতুন রূপে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর মধ্যে বাসাবাড়ি, বিদ্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত সাতটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলই ছিল সিলেট বিভাগের গোলাপগঞ্জ, জগন্নাথপুর, মাইঝবাগ ও নবীগঞ্জ। রিখটার স্কেলে এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫, ৩ দশমিক ৫, ৩ দশমিক ৪, ৩ দশমিক ৪, ২ দশমিক ৮, ৩ দশমিক ৫ ও ২ দশমিক ৮। এছাড়া গত দুই বছরে সিলেট ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দেড় শতাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূতাত্ত্বিক অবস্থান ও ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে সিলেট প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ। এ অঞ্চল বড় ধরনের ভূমিকম্পের মুখোমুখি হতে পারে। এতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে পুরো নগরী।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মুশতাক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিলেট নগরে গড়ে ওঠা প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ ভবন নির্মাণে যথাযথ বিধিমালা মানা হয়নি। ফলে ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রফেসর মুশতাক বলেন, ‘পুরোপুরিভাবে ভূমিকম্প মোকাবেলা সম্ভব না হলেও আগে থেকে কিছু সতর্কতা অবলম্বন এবং পদক্ষেপ নিলে এর তীব্র ক্ষয়ক্ষতি থেকে কিছুটা বাঁচা যাবে।’
২০১৯ সালের এপ্রিলে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নগরের ২৪টি ভবনকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সিসিকের তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে কালেক্টরেট ভবন ৩, সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয়, সুরমা মার্কেট, বন্দর বাজার এলাকার সিটি সুপার মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, দরগা গেটের আজমীর হোটেল, মধুবন মার্কেট, কালাশীল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন। যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন, পুরান লেন এলাকার ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ী এলাকার ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা ৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা ৩৭৭/৮, শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা ৩৭৭/৯, বনকলাপাড়া এলাকার নূরানী ১৪, ধোপাদিঘী দক্ষিণপাড়ের পৌর বিপণি ও পৌর শপিং সেন্টার এবং পূর্ব পীর মহল্লার লেচুবাগান এলাকার ৬২/বি প্রভাতী ও শ্রীধরা হাউজ। তালিকায় থাকা চারটি ভবন অপসারণ করা হয়েছে। আরো দুটি ভবনকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সংস্কার করা হয়। তবে ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি ১৮টি ভবনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এসব ভবনে বাসা ও সরকারি দপ্তর রয়েছে। যেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাই রাফিন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তালিকায় থাকা কিছু ভবন অপসারণ করা হয়েছে। আরো কিছু ভবনের প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে শাবিপ্রবির বিশেষজ্ঞ দ্বারা সংস্কার করা হয়েছে। অবশিষ্ট ভবনগুলো অপসারণে জরুরি নোটিস জারি করা হয়েছে। সচেতন না হলে আমাদেরই এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’